প্রস্তাবিত ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করে দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে পাঞ্জাবের কৃষকেরা। তবে দিল্লিতে আয়োজিত ‘কিষাণ মহাপঞ্চায়েত’-এ যোগ দিতে যাওয়া কৃষকদের পথ রোধ করতে পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তে বসানো হয়েছে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরের দিকে শম্ভু সীমান্তে পাঞ্জাবের শত-শত কৃষককে পুলিশ আটকে দিয়েছে বলেও বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
শম্ভু সীমান্তে কৃষকদের ঠেকাতে কংক্রিটের ব্লক, লোহার কাঁটা ও বিভিন্ন নিরাপত্তা প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করে পুলিশ। এ পরিস্থিতি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির বহুল আলোচিত ‘দিল্লি চলো-২’ কৃষক আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।
এদিকে, দিল্লিতে প্রবেশ করতে না পেরে কৃষকেরা শম্ভু সীমান্ত এলাকাকেই প্রতিবাদস্থলে পরিণত করেন। তারা অভিযোগ করেন, দিল্লিতে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় হরিয়ানা ও পাঞ্জাব—দুই রাজ্য সরকারেরই সমালোচনা করেছেন কৃষক নেতারা।
এর আগে, ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে আয়োজিত এই কিষাণ মহাপঞ্চায়েতে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন কৃষক সংগঠন অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়। প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা বন্ধ করার দাবিতে এ কর্মসূচি ডাকা হয়।
কিষাণ মজদুর সংঘর্ষ কমিটির (কেএমএসসি) নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের বলেন, ‘কেএমএসসি, কিষাণ মজদুর মোর্চার পাঞ্জাব শাখা, আজাদ কিষাণ মোর্চা এবং ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়ন একতা সংঘর্ষসহ কয়েকটি সংগঠন পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকা থেকে দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল। পরে শম্ভু সীমান্তে তাদের আটকে দেওয়া হয়।’
কৃষক নেতা তেজবীর সিং অভিযোগ করেন, হরিয়ানা পুলিশ পাঞ্জাবের ভূখণ্ডের ভেতরে ব্যারিকেড স্থাপন করেছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় পাঞ্জাব সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
তবে পাঞ্জাবের কৃষকদের শম্ভু সীমান্তে আটকে দেওয়া হলেও হরিয়ানার আম্বালা, কুরুক্ষেত্রসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা দিল্লির দিকে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
কৃষক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতের বাজার আরও উন্মুক্ত হতে পারে। এতে ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভারতের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
কৃষক নেতারা বলেন, চুক্তির আওতায় কৃষি, দুগ্ধ, শিল্প, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, বিনিয়োগ, সরকারি ক্রয়, মেধাস্বত্ব ও সেবা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এর আগে সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, ইথানল, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য, হাঁস-মুরগি ও মৎস্যজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়েছে।
কৃষক সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, ভারতের দুগ্ধ খাতের ওপর প্রায় ৮ কোটি গ্রামীণ পরিবার নির্ভরশীল। এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে চুক্তি-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ এবং কৃষক, শ্রমিক, দুগ্ধ উৎপাদক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো চুক্তি না করার দাবি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, কৃষকদের দিল্লিযাত্রা ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। দিল্লিতে আরেকটি ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে কৃষকদের কর্মসূচি শুরু হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।