হিমবাহধসের কারণে নেপালে সৃষ্ট বন্যার ৯ দিন পর ত্রিশূলী–৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়।
তাদের একজন সঞ্জয় শাহ, অন্যজন কবির মহারাজন।
এখনো ওই সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।
নেপাল বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুরেশ রাউত উদ্ধারস্থল থেকে বিবিসিকে বলেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, প্রথমে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে কণ্ঠস্বর শোনার পর উদ্ধারকারীরা চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আতঙ্কিত হবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি।’
এরপর তারা ভেতর থেকে ‘ওকে’ বলার একটি ‘ক্ষীণ সাড়া’ শুনতে পান।
উদ্ধারের পর সঞ্জয় শাহকে উড়োজাহাজে রাজধানী কাঠমান্ডুর উত্তর-পশ্চিমে বাত্তার এলাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কবির মহারাজনকে চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুর ছাউনি সামরিক হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কর্তৃপক্ষ বিবিসিকে জানিয়েছে, প্রথম উদ্ধার হওয়া সঞ্জয় শাহ কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। তবে দ্বিতীয় ব্যক্তি কবির মহারাজন উদ্ধারের পর হাসছিলেন। তিনি অন্যদের ধন্যবাদ দেন।
উদ্ধার হওয়া শ্রমিক কবির মহারজানের ভাই আমির মহারজান জানিয়েছে, তিনি উদ্ধার হওয়ায় ‘খুবই খুশি’।
তিনি এএফপি সংবাদ সংস্থাকে বলেন, ‘আমার মনটা এখন হালকা লাগছে। পুরো পরিবার খুব খুশি।’

ছবিতে থাকা ব্যক্তিটি হলেন কবির মহারজন। বিবিসি।
উদ্ধারপ্রাপ্ত শ্রমিক কবির মহারজনের স্ত্রী হীরাশোভা বিবিসি নেপালিকে জানিয়েছেন, তার স্বামীকে জীবিত খুঁজে পাওয়ায় তিনি কতটা খুশি।
তিনি বলেন, ‘আমি ফেসবুকে ছবিগুলো দেখেছিলাম। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। তাকে কাঠমান্ডুর সেনা হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। আমি হাসপাতালের দিকে রওনা হচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ১০ দিন ধরে ঠিকমতো খেতে বা পান করতে পারিনি। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। এখন আমরা সবাই খুশি। আমরা কাঁদছিও।’
উদ্ধার পাওয়া উভয় শ্রমিকের হাত ও পায়ে আঘাত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে টানেলের ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার কারণে এই আঘাত পেয়েছেন তারা। তারা অক্সিজেনের অভাবে ভুগছেন বলে নেপাল বিদ্যুৎ সংস্থার (এনইএ) কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন।
সঞ্জয় শাহ নেপাল বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মী বলে ওই বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান। তার সহকর্মী সুরেশ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, ‘আমি ভীষণ খুশি! এ খবরের অপেক্ষায় ছিলাম। এতে আশা জেগেছে যে অন্যদেরও জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে।’
একজন টানেলিং বিশেষজ্ঞ এএফপি সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন যে, উদ্ধারের আগে দলগুলো টানেলের ৫০ থেকে ৬০ মিটার (১৬৪ থেকে ১৯৬ ফুট) পর্যন্ত ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে পথ তৈরি করেছিল।
ইন্টারন্যাশনাল টানেলিং অ্যান্ড আন্ডারগ্রাউন্ড স্পেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আর্নল্ড ডিক্স বলেন, তারা একটি বড় ধরনের সাফল্যের আশা করছিলেন – এবং তারপরেই তারা দুজন জীবিত ব্যক্তিকে বের করে আনেন।
ডিক্স বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি আশাবাদী। এক সপ্তাহ ধরে দিনরাত দুশ্চিন্তার পর, আমরা হয়তো আবারও অলৌকিকতার জগতে ফিরে এসেছি।’

উদ্ধার পাওয়া একজনকে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। রয়টার্স।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুরেশ রাউত বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাদের ধারণা অনুযায়ী টানেলের ভেতরে ৩৯ জন শ্রমিক রয়েছেন। এর মেধ্য কতজন বেঁচে আছেন তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে টানেল থেকে আজ শুক্রবারের মধ্যে আরও মানুষকে উদ্ধার করা হবে বলে তিনি আশা করেছেন।
এইসব ধ্বংসযজ্ঞ আর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসা সম্ভাবনার মাঝেও, এই উদ্ধার ছিল একটি আশার মুহূর্ত।
এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ, যাদের মধ্যে সুড়ঙ্গে আটকা পড়া শত শত শ্রমিকও রয়েছেন, যাদের অনেকেই মারা গেছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই অভিযানগুলো অত্যন্ত কঠিন, কারণ উদ্ধারকারীদের কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ভরা জলমগ্ন সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে পথ করে নিতে হচ্ছে। উদ্ধাকারী দলগুলো আগে সুড়ঙ্গের উপরিভাগে বিস্ফোরক দিয়ে একটি গর্ত তৈরি করে তারপর দড়ি বেয়ে নিচে নামে। সুড়ঙ্গে খননযন্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে এবং সুড়ঙ্গে অক্সিজেনও পাম্প করে পাঠানো হচ্ছে।
বেঁচে যাওয়া মানুষদের এখন চিকিৎসার জন্য আকাশপথে সেনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে আরও জীবিত মানুষকে এই সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হবে।
শুধু ত্রিশূলী ৩এ প্রকল্প নয়, আরও অন্তত ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে পৃথক উদ্ধার অভিযান চলছে। এসব সুড়ঙ্গে ১৫০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভয়াবহ এই আকস্মিক দুর্যোগে নেপালে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।