ঢাকা: ফেসবুক ও টিকটক ব্যবহার না করার শর্তে ১৩ বছর বয়সী মায়ের কাছে তার ৭ মাস বয়সী শিশুকে আপাতত বুঝিয়ে দিয়েছে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড। একই সঙ্গে শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব নির্ধারণে বাবার করা আবেদন যথাযথ পারিবারিক আদালতেই নিষ্পত্তি হবে বলে জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শুনানি শেষে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
তিনি বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী দুগ্ধপোষ্য সাত মাস বয়সী শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় আপাতত তাকে মায়ের কাছেই রাখা হবে। তবে স্থায়ী অভিভাবকত্ব নির্ধারণের এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের। শুনানিতে কিশোরী ভবিষ্যতে টিকটক, ফেসবুকসহ কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ না করার অঙ্গীকার করেন। পাশাপাশি শিশুর লালন-পালনে মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।
এদিকে কিশোরীর পরিবার জানিয়েছে, ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া, কথিত বিয়ে, যৌন নির্যাতন ও প্রতারণার অভিযোগে তারা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, কিশোরীর বয়স ২০ বছর এবং তারা পারিবারিক আদালতে ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশাবাদী।
লিগ্যাল এইডের ভূমিকা নিয়ে ব্যাখ্যা
মো. সায়েম খান বলেন, অনেকেই মনে করছেন আদালতের নির্দেশে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাস্তবে এটি আদালতের আদেশ নয়। ২০২৫ সালে সংশোধিত আইনের আওতায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের ক্ষমতাবলে চকবাজার থানাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে।
তিনি আরও বলেন, লিগ্যাল এইডের দায়িত্ব শুধু আইনজীবী নিয়োগ নয় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, আইনি পরামর্শ এবং অসহায় মানুষের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাও এর কাজ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা
শুনানিতে কিশোরী ও তার পরিবারের সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার বলেন, অভিভাবকদের সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রমের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অল্প বয়সে সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ না করলে নানা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন বা মানহানিকর তথ্য প্রচার আইনগত অপরাধ হতে পারে। তাই ব্যক্তি ও গণমাধ্যম উভয়কেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
কিশোরীর আইনজীবীর বক্তব্য
কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র জানান, দুগ্ধপোষ্য হওয়ায় শিশুটি আপাতত মায়ের কাছেই থাকবে। তিনি দাবি করেন, কিশোরীর প্রকৃত বয়স ১৩ বছর ৫ মাস ১৩ দিন এবং অনলাইনে থাকা জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, স্ট্যাম্প বা নোটারির মাধ্যমে তৈরি কাগজ কোনো বৈধ বিয়ের দলিল নয়। নাবালিকাকে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া, কথিত বিয়ে, যৌন নির্যাতন ও প্রতারণার ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে।
অভিযুক্ত পক্ষের দাবি
অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, তাদের কাছে কিশোরীর বয়স ২০ বছর হওয়ার পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। পারিবারিক আদালতে চলমান গার্ডিয়ানশিপ মামলায় তারা ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
ঘটনার পটভূমি
অভিযোগ অনুযায়ী, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় টিকটকের মাধ্যমে শাকিল মিয়া নামে এক যুবকের সঙ্গে কিশোরীর পরিচয় হয়। পরে তাকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে নোটারির মাধ্যমে কথিত বিয়ের কাগজ তৈরি করা হয়। পরিবারের দাবি, কোনো বৈধ কাবিন হয়নি। পরবর্তীতে কিশোরী একটি সন্তানের জন্ম দেন এবং কয়েক মাস পর শিশুটিকে তার কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়।
চলতি বছরের ২০ মে কিশোরী ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আবেদন করেন। পরে লিগ্যাল এইডের নির্দেশে গত ২৮ জুলাই চকবাজার থানা পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়।
এখন কী হবে
লিগ্যাল এইডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিশুটি আপাতত মায়ের কাছেই থাকবে। তবে এটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। শিশুর স্থায়ী হেফাজতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন পারিবারিক আদালত। একই সঙ্গে কিশোরীর পরিবার অপহরণ, বাল্যবিয়ে, যৌন নির্যাতন ও প্রতারণার অভিযোগে পৃথক ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আইন কী বলছে
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষের ২১ বছর। এর কম বয়সে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে বাল্যবিয়ে হিসেবে গণ্য হয়। আইন অনুযায়ী, উভয় পক্ষের স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া কোনো বিয়ে বৈধ নয়।
আইনজীবীদের মতে, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা অ্যাফিডেভিট মুসলিম বিয়ের আইনগত বিকল্প নয়। নিবন্ধিত কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে কাবিন সম্পন্ন ও নিবন্ধিত হলেই কেবল সেই বিয়ে আইনি স্বীকৃতি পায়।
এ ছাড়া সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ক স্থাপন ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।