ঢাকা: ২০২৪ সালে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে’ আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে বেশ জলঘোলা হয়েছে। তাকে অপসারণের দাবি তুলেছিল অভ্যুত্থানকারী বিভিন্ন পক্ষ। এমনকি তার পদত্যাগ দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও চলে। তবে সাংবিধানিক সংকটের কথা বলে বিএনপি রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেকটা হাঁফ ছাড়েন সাহাবুদ্দিন। তিনি চলে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন। তবে বিএনপি এ নিয়ে কিছু বলেনি। কিন্তু সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য লন্ডন ঘুরে আসার পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এর পর শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এখন সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের আগে থেকেই তার বিচার দাবি করে আসছিল জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলো। সম্প্রতি তিনি পদত্যাগ করার পর সেই দাবি আরও জোরালো হয়েছে। পদত্যাগের একদিন পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ এবং গ্রেফতারের আবেদন জমা পড়ার পাশাপাশি আগে দায়ের হওয়া অভিযোগগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালের অভিযোগ বিষয়ে কিছু না হলেও আগের অভিযোগগুলোর তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সেগুলো নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন তিনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন ও ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই আন্দোলন, গুম, হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একাধিক আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের কয়েকটিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সর্বশেষ বাংলাদেশ আজাদ পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার ফোরাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা দিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও গ্রেফতারের আবেদন জানায়। সংগঠন দুটির দাবি, দেশের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত গণহত্যা, গুম ও হত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ ছাড়া, জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা আরও কয়েকটি অভিযোগেও সাহাবুদ্দিনের নাম এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (Formal Charge) গঠন করা হয়নি।
আগের অভিযোগ কি নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে?
আইনজ্ঞদের মতে, একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকলে তদন্ত সংস্থা প্রতিটি অভিযোগ পৃথকভাবে পর্যালোচনা করে। কোনো অভিযোগ আগে দায়ের করা হয়েছে বলে তা গুরুত্ব হারায় না। বরং, তদন্তে নতুন সাক্ষ্য, নথি, ভিডিও, অডিও বা অন্যান্য প্রমাণ পাওয়া গেলে পুরোনো অভিযোগও নতুন করে আইনি গুরুত্ব পেতে পারে।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে পাঠানো হয়। প্রসিকিউশন সন্তুষ্ট হলে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এর পর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গ্রহণ করলে বিচার শুরু হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনি প্রক্রিয়া
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর প্রথমে তদন্ত সংস্থা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে। এরপর সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ, নথিপত্র ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে পাঠানো হয়। প্রসিকিউশন অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পেলে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ট্রাইব্যুনাল তা গ্রহণ করলে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। বিচার শেষে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেন। অর্থাৎ, অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই কোনো ব্যক্তি দোষী এমনটি আইন বলে না।
সরকারের অবস্থান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সাবেক রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতারের দাবি জানালেও তা আমলে নেওয়ার মতো কোনো আইনি ভিত্তি সরকার দেখছে না। দায়িত্ব পালনকালে সংবিধান অনুযায়ী তিনি দায়মুক্তি ও বিশেষ অধিকার ভোগ করেছেন, তাই ওই সময়ের কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সুযোগ নেই। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আইন অনুযায়ী তিনি সবধরনের প্রটোকল, নিরাপত্তা (এসএসএফ ও পিজিআরসহ ছয় মাস) এবং প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
অপরদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, দুদক চেয়ারম্যান ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অতীতের দুর্নীতির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে কাউকে অবিচার বা হয়রানির শিকার হতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আইনমন্ত্রী ড. আসিফ নজরুল (বর্তমান আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী) এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো আইনের আলোকে যাচাই করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘জনমতের গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি কাউকে যেন অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত বা অবিচারের শিকার হতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।’
অন্যদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো আদালতের নির্দেশনা এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তদন্ত ও আইনি ভিত্তিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।’
আইন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, ‘অভিযোগ দায়ের এবং বিচার শুরু সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করতে হলে অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেনও আইনের শাসন নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, ‘যেকোনো মামলায় ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত হলো- সুষ্ঠু তদন্ত, স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে দায়ের হওয়া অভিযোগগুলো তদন্তে নতুন তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে শক্তিশালী হলে সেগুলো থেকেও আইনি প্রক্রিয়া এগোতে পারে। তবে আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা আইনগসঙ্গত নয়।
মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া অভিযোগ তদন্ত ও আইনি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন হয়নি এবং কোনো আদালত তাকে দোষী সাব্যস্তও করেননি। তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে পুরোনো ও নতুন উভয় ধরনের অভিযোগই পরবর্তী আইনি ধাপে অগ্রসর হতে পারে। অন্যদিকে অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ না মিললে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ খারিজও হতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে দায়ের হওয়া অভিযোগগুলো বাংলাদেশের আলোচিত আইনি বিষয়গুলোর একটি। নতুন অভিযোগের পাশাপাশি আগে দায়ের হওয়া অভিযোগগুলোর ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধান, প্রসিকিউশনের মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তার দায় বা নির্দোষিতা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আইনের শাসনের মূল নীতি অনুযায়ী, আদালতের চূড়ান্ত রায়ই এ বিষয়ে শেষ কথা।