Wednesday 22 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল হলেও রাস্তায় ঝরছিল তাজা প্রাণ

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২১ জুলাই ২০২৬ ১৭:০৯ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ ১৮:১৯

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: চারিদিকে থমথমে নিস্তব্ধতা, পুরো দেশ ইন্টারনেটহীন অবস্থায় ডিজিটাল দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, আর রাজপথে সাঁজোয়া যান ও বুলেটের তীব্র শব্দে কেঁপে উঠছিল অলিগলি। ২০২৪ সালের ২১ জুলাই, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের পাতায় এক রক্তঝরা ও তীব্র উত্তেজনাকর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। একদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাসে উচ্চ আদালতের বিতর্কিত রায় বাতিল করে সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগের ঐতিহাসিক আদেশ দেওয়া হচ্ছিল, অন্যদিকে দেশের পিচঢালা রাজপথ ভেসে যাচ্ছিল তরুণদের তাজা রক্তে। চতুর্থ দিনের মতো চলতে থাকা চরম কড়া কারফিউয়ের মধ্যেই পুরো দেশ যখন এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই রাজপথের অদম্য আন্দোলন আর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনি নিষ্পত্তির এক অভূতপূর্ব মুখোমুখি অবস্থান দেখে পুরো বিশ্ব।

বিজ্ঞাপন

এজলাসে স্বস্তি রাজপথে লাশ

সেদিন সকালের সূর্য ওঠার পর থেকেই সবার চোখ ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দিকে। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল বলে ঘোষণা করেন।

আদালতের আদেশে বলা হয়, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। অবশিষ্ট সাত শতাংশ কোটার মধ্যে পাঁচ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের জন্য, এক শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাকি এক শতাংশ প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য নির্ধারিত থাকবে।

তবে এই ব্যবস্থার বাইরেও সরকার চাইলে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যেকোনো সময় কোটা বাতিল, পরিবর্তন বা পুনর্বিন্যাস করার আইনি ক্ষমতা ধরে রাখবে বলে আদালত স্পষ্ট করে দেয়। কিন্তু, আইনের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের সুসংবাদ যখন বাতাসের সাথে ছড়িয়ে পড়ছিল, ততক্ষণে দেশের রাজপথে ঝরে গেছে ১৯টি তাজা প্রাণ।

ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রাজপথ ও দেখামাত্র গুলির নির্দেশ

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঠেকাতে দিনভর নিরাপত্তা বাহিনীকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত আলোচনায় আসে। রাজধানীর বাড্ডা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও কুড়িলে ক্ষণে ক্ষণে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে। শুধু ঢাকাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ১০ জন। এ ছাড়া নরসিংদীতে চারজন, গাজীপুরে দু’জন এবং সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে একজন করে প্রাণ হারান।

সারা দেশে কারখানা বন্ধ থাকার সুযোগে সিদ্ধিরগঞ্জের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৯টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের কার্যালয়সহ বিভিন্ন ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের গাজীপুরের বাসভবনেও সেদিন দুই দফা হামলা চালানো হয়। এসব ঘটনার মধ্যেই ভোরে পূর্বাচল এলাকা থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে, যাকে এর আগে খিলগাঁও থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল।

গণভবনে জরুরি বৈঠক ও গ্রেফতারের পাহাড়

পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে ২১ জুলাই রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে দেশের শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন। তিন বাহিনীর প্রধান, সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারদের উপস্থিতিতে পুরো দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং চলমান কারফিউ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একইসঙ্গে সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগে সারা দেশে ব্যাপক চিরুনি অভিযান চালিয়ে সাড়ে ৫০০ জনেরও বেশি ছাত্র-জনতাকে গ্রেফতার করা হয়। শুধু ঢাকাতেই গ্রেফতার হন বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নিপুণ রায় এবং গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরসহ প্রায় দুই শতাধিক নেতা-কর্মী। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকমিশনও তাদের ৩১ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সকল পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

শর্তের বেড়াজালে রাজপথের আলটিমেটাম

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে আন্দোলনকারীরা তাদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের প্রথম আইনি বিজয় হিসেবে স্বাগত জানায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে সমন্বয়ক সারজিস আলম প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন যে, আদালতের রায়কে তারা সুবিচারের একটি চমৎকার সূচনা হিসেবে দেখছেন, তবে চূড়ান্ত সমাধান নির্ভর করছে সরকারের নির্বাহী প্রজ্ঞাপনের ওপর।

নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে আন্দোলনকারীরা শাটডাউন কর্মসূচি সাময়িক প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও অবিলম্বে চার দফা দাবি পূরণের জন্য ৪৮ ঘণ্টার কড়া আলটিমেটাম জারি করে। এই দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- অবিলম্বে বলবৎ থাকা সান্ধ্য আইন বা কারফিউ প্রত্যাহার করা, বন্ধ থাকা ইন্টারনেট সংযোগ সচল করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হলগুলো খুলে দেওয়া এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সকলের সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া। এর পাশাপাশি নিহতদের স্মরণে পরদিন সারা দেশে গায়েবানা জানাজার মতো আবেগঘন কর্মসূচি ঘোষণা করে ছাত্রসমাজ।

নাহিদ ইসলামের সন্ধান

এদিন ভোরে ঢাকার পূর্বাচল এলাকায় আন্দোলের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে পাওয়া যায় এবং পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে শুক্রবার (১৯ জুলাই) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থেকে নাহিদ ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

ইতিহাসের পাতায় রক্তাক্ত এক মোড়

আইনের কাগজে ৯৩ শতাংশ মেধার জয় হলেও ২১ জুলাইয়ের বিকেলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীরভাবে বিষাদময় বার্তা নিয়ে এসেছিল। এজলাসের যুক্তিতর্ক আর সরকারের প্রশাসনিক কঠোরতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে জীবনগুলো ঝরে গেল, তা আন্দোলনের গতিপথকে এক অভূতপূর্ব মোড়ে এনে দাঁড় করায়। একদিকে স্বজনদের কান্না আর আহতদের আর্তনাদে হাসপাতালগুলো ভারী হয়ে উঠেছিল, অন্যদিকে প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তায় দিন গুনছিল।

আইনি রায়ের মাধ্যমে কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত হলেও ২১ জুলাইয়ের সেই আগুনের ধোঁয়া আর রাজপথের রক্ত তরুণের চেতনায় এমন এক গভীর দাগ রেখে যায়, যার প্রতিধ্বনি শুধু কোটা আন্দোলনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তৎকালীন রাজনীতির সমগ্র ইতিহাসকেই চিরতরে বদলে দেওয়ার প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করে দেয়।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর