ঢাকা: নীরবতার এক ভারী পাথর যেন পুরো শহরের বুকে চেপে বসেছিল, আর সেই নিস্তব্ধতার চাদর ফুঁড়ে থেকে থেকে ভেসে আসছিল বুটের আওয়াজ আর চাপা হাহাকার। ২০২৪ সালের ২৪ জুলাইয়ের সকালটা ছিল এক অনিশ্চিত ও আতঙ্কিত জীবনের এমন এক অধ্যায়, যেখানে একদিকে কারফিউর কঠোর শাসন ও চোখবাঁধা গুমের ভয়, অন্যদিকে সংবাদের তীব্র তৃষ্ণায় ছটফট করা কোটি মানুষের জীবন। ইতিহাসের পাতায় এই দিনটি রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এক রক্তঝরা উপাখ্যানের নাম।
থমথমে সড়ক ও অবরুদ্ধ জীবন
টানা পাঁচ দিন বন্দি থাকার পর সেদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল। অন্নসংস্থান আর নিত্যপ্রয়োজনে মানুষ যখন রাস্তায় নামল, তখন তাদের চোখে ছিল না কোনো স্বস্তি, ছিল শুধুই অজানা আতঙ্ক ও জমে থাকা নীরব ক্ষোভ। রাজপথজুড়ে সেনাসদস্য, পুলিশ ও র্যাবের টহল গাড়িগুলো যেন পুরো নগরীকে এক অবরুদ্ধ সেনাঘাঁটিতে পরিণত করেছিল। দূরপাল্লার বাস ও লঞ্চ চলাচল সীমিত পরিসরে শুরু হলেও ঢাকার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দিনভর দফায় দফায় তীব্র সংঘর্ষ চলে। দীর্ঘ সময়ের সংঘাতের পর অভিযানের মুখে বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছাড়তে বাধ্য হন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকার সন্ধানে বের হওয়া প্রতিটি মানুষকে পড়তে হচ্ছিল কঠোর জেরা ও তল্লাশির মুখে।
দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান ও গ্রেফতারের ছায়া
রাজপথ যখন রক্তে রঞ্জিত, ঠিক তখনই প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেমে আসে চিরুনি অভিযানের নির্মম খড়গ। কেবল ২৪ জুলাইয়ের এক দিনেই সারাদেশে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়, যার মধ্যে এককভাবে ঢাকাতেই আটক হন ৬৪১ জন। টানা আট দিনের মাথায় সারাদেশে গ্রেফতারকৃত মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজারে গিয়ে পৌঁছে। চিরুনি অভিযানের এই জালে বন্দি হন ছাত্র, সাধারণ পথচারী, রাজনীতিবিদের পাশাপাশি দিনমজুর আর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। সরকার পক্ষ থেকে এদের বেশিরভাগকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী দাবি করা হলেও, তাদের বিরাট একটি অংশই ছিল আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থী। দেশের অলিগলিতে তখন শুধু ভয়ের রাজত্ব আর স্বজন হারানোর আকুল আর্তনাদ।
অন্ধকারের মাঝে ধীর গতির ইন্টারনেট
টানা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার পর সেদিন রাত ১০টায় দেশে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পুনরায় চালু করা হয়, যদিও মোবাইল ইন্টারনেট তখনও পুরোপুরি স্তব্ধ রাখা হয়েছিল। ইন্টারনেটের এই ক্ষীণ আলোর ভেতরেই উন্মোচিত হতে শুরু করে গুম ও নিখোঁজের নানা বিভীষিকাময় চিত্র। বেশ কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদকে পরিত্যক্ত জায়গায় চোখবাঁধা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। হাতিরঝিল ও ধানমন্ডি এলাকায় তাদের ফেলে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিভীষিকার খবর। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া রিফাত রশীদ ফেসবুকে লেখেন, গুম হতে হতে অল্পের জন্য তিনি রক্ষা পেয়েছেন। মনের গহীনে আতঙ্কের শিকড় নিয়ে সেদিন ইন্টারনেট চালু হয়েছিল এক বিষাদময় তথ্য পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে।
মর্গে পরিচয়হীন লাশের মিছিল
হাসপাতালগুলোতে মৃত্যু ও যন্ত্রণার প্রহর যেন থামছিলই না। ঢাকা মেডিকেল ও এনাম মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেদিন আরও চারজন মারা যান। ফলে সরকারি হিসাবেই ২৪ জুলাই পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০১ জনে। তাদের মধ্যে আটজন অচেনা ও পরিচয়হীন নিহতের মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের মর্গ থেকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বেওয়ারিশ পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো কে ছিলেন, তা আজও জানা যায়নি, তারা কি কোনো মায়ের বুক খালি করা ছাত্র, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম শ্রমিক নাকি কোনো নিরপরাধ পথচারী? রাষ্ট্রের খাতায় তারা কেবল একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা হিসেবে জমা হয়ে রইল, আর স্বজনদের কাছে রেখে গেল না শেষবার দেখার সুযোগটুকুও।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বৈঠক
পরিস্থিতি যখন অগ্নিগর্ভ, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কার্যালয়ে এডিটরস গিল্ডের আয়োজনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বার্তা প্রধানদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বসেন। বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুরো আন্দোলনকে একটি গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, বিরোধীদল নির্বাচন পণ্ড করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েই এমন ধ্বংসাত্মক আঘাত এনেছে। সেই বৈঠকে উপস্থিত বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ছাত্র আন্দোলন দমনে সরকারকে নানা ধরনের পরামর্শ প্রদান করেন। নাঈমুল ইসলাম খান, মোজাম্মেল বাবু, আবেদ খান, নঈম নিজাম, মনজুরুল ইসলাম, শ্যামল দত্ত, সাইফুল আলম, ফরিদা ইয়াসমিন, সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, দীপ আজাদ, মাইনুল আলম, শাহজাহান সরদার, জায়েদুল আহসান পিন্টু, আশীষ সৈকত, জুলফিকার রাসেল ও শাকিল আহমেদের মতো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা সেদিনের সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বমঞ্চে সরকারের সাফাই ও পেন্টাগনের প্রতিক্রিয়া
আন্দোলনের ভয়াবহতার মধ্যে আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে সরকার বিদেশি কূটনীতিকদের নিয়ে এক বিশেষ পরিদর্শনের আয়োজন করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের নেতৃত্বে ৪৯টি কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি ও ২৩ জন রাষ্ট্রদূতকে ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল, বিটিভি ভবন, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও সেতু ভবন ঘুরিয়ে দেখানো হয়। সরকার তাদের সামনে প্রচার করতে চায় যে আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রের সম্পদে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের মুখপাত্র প্যাট রাইডার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়ে সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে দাবি করলেও, সাধারণ মানুষের কাছে সেই পরিস্থিতি ছিল মূলত ভয় দেখিয়ে শ্বাসরোধ করে রাখার মতো এক অভিজ্ঞতা।
অবরুদ্ধ শিক্ষা ও ভঙ্গুর রাষ্ট্রযন্ত্র
সহিংসতা ও সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নতুন সেমিস্টারের ভর্তি পরীক্ষা এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষাসহ ৩১ জুলাই পর্যন্ত সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে নরসিংদী কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে ২৯২ জন আত্মসমর্পণ করেন এবং পুলিশ দুই নারী বন্দিকে ফের গ্রেফতার করে। রাষ্ট্র যে তার নিয়ন্ত্রণ ও আস্থার জায়গা কতটা হারিয়ে ফেলেছিল, বন্দিদের এই পালিয়ে যাওয়া ও আত্মসমর্পণের ঘটনাটিই তার বড় প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।
দাবিনামা ও আন্দোলনের নতুন মোড়
একদিকে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযান ও গণগ্রেফতার চলছিল, অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা চার দফা ‘জরুরি দাবি’ উত্থাপন করেন। ইন্টারনেট পূর্ণাঙ্গ চালুকরণ, কারফিউ প্রত্যাহার, গ্রেফতার বন্ধ ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে তারা সরকারকে দুই দিনের আলটিমেটাম বেঁধে দেন। সমন্বয়করা সাফ জানিয়ে দেন, এই জরুরি দাবিগুলো না মানলে তাদের মূল আট দফা দাবি নিয়ে আলোচনার কোনো অবকাশ নেই। এই আলটিমেটামের সাথেই ২৫ জুলাই দেশব্যাপী নতুন করে গণসংযোগ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়, যা আন্দোলনকে এক নতুন ও আপসহীন লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
২৪ জুলাইয়ের সেই দীর্ঘতম দিনটি শেষ হয়েছিল গুমোট এক অন্ধকার আর গভীর শঙ্কার মধ্য দিয়ে। বন্দুকের নল আর প্রশাসনিক ব্যবস্থার সামনে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ সেদিন সাময়িকভাবে দমিত মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে জ্বলছিল ক্ষোভের প্রবল আগুন। যে আগুনের উত্তাপ রাষ্ট্র সেদিন আঁচ করতে পারেনি, তা পরবর্তী সময়ে অদম্য এক মুক্তিকামী ঝড়ে পরিণত হয়ে ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত তৈরি করে রেখেছিল।