ঢাকা: রাজধানীর বাতাসে বারুদের তীব্র গন্ধ আর আতঙ্কের ছাপ। আগেরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের তিন প্রধান মুখ্য সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং আবু বাকের মজুমদারকে। ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন, অর্থাৎ ২৭ জুলাই ২০২৪, গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আরও দুই সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে। সরকারি দফতর থেকে বলা হলো, এই পদক্ষেপ নাকি কেবলই ‘সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে’। কিন্তু রাজপথের প্রতিরোধে নামা শিক্ষার্থীদের কাছে এটি ছিল স্রেফ কণ্ঠরোধের এক পরিচিত দমননীতি।
২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ও তপ্ত রাজপথ
সমন্বয়কদের সরিয়ে নিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা হলেও শিক্ষার্থীরা পিছু হটেনি। ২৭ জুলাই রাতে ভার্চুয়াল এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীরা সরকারের উদ্দেশে ছুড়ে দেন ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম। তাদের মূল দাবি ছিল তিনটি। আটক সব সমন্বয়কের নিঃশর্ত মুক্তি ও দায়মুক্তি, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দেওয়া সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং সংঘাতে জড়িত সর্বস্তরের দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার।
সংগঠকেরা সাফ জানিয়ে দেন, রোববার ২৮ জুলাই থেকে অনলাইন ও অফলাইনে সমান গতিতে চলবে প্রচার। দেয়াল লিখন, আন্তর্জাতিক দূতাবাসে স্মারকলিপি প্রদান, এমনকি আক্রান্তদের সহায়তায় ‘হেলথ ফোর্স’ ও ‘লিগ্যাল ফোর্স’ গঠনের মতো সুসংগঠিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও দমন-পীড়নে এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ২৬৬ জন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ, আর গ্রেফতারের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
নজিরবিহীন গ্রেফতার ও ‘ব্লক রেইড’
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তখন চলছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযান ও নজিরবিহীন ‘ব্লক রেইড’। শনিবার রাত পর্যন্ত সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় ভাঙচুরের অভিযোগে ৭৩৬টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়, যার সিংহভাগ বাদী ছিল পুলিশ। শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই ২০৭টি মামলায় ২ হাজার ৫৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়, অন্যদিকে র্যাবের মিডিয়া কর্মকর্তা আ ন ম ইমরান খান জানান, সাম্প্রতিক নাশকতা ও সংঘর্ষের অভিযোগে তারা সারাদেশে আরও ২৯০ জনকে গ্রেফতার করেছে। একই দিনে সিলেটে ১১টি মামলায় ১৪৩ জন গ্রেফতার হন।
ডিবি হারুন-এর ভাতের হোটেল ট্রল
এই চরম গ্রেফতার আতঙ্কের মাঝেই গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবি কার্যালয়ে ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন-অর-রশিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে ডিবি হেফাজতে থাকা সমন্বয়কদের টেবিলভর্তি খাবারের মুখোমুখি বসিয়ে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিষয়টিকে আতিথেয়তা হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করা হলেও সাধারণ মানুষ ও ক্ষুব্ধ নেটিজেনরা একে ‘ডিবির ভাতের হোটেল’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ট্রল ও প্রতিবাদের ঝড়ে উড়িয়ে দেন।
আন্তর্জাতিক চাপ, বিশ্বমঞ্চে ইউনূস ও ১৪ মিশনের চিঠি
দেশের ভেতরের এই অন্যায় দমন-পীড়নে কেঁপে ওঠে পুরো বিশ্ব বিবেক। এই প্রথম কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সারাদেশে চলা সহিংসতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ভারতের ‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস দেশের বর্তমান পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ মধ্যবর্তী নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে বলেন, “গণতন্ত্রে সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে একটি প্রকৃত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। জনগণের নির্দেশনায় গণতন্ত্রের সমস্যার প্রতিকার সম্ভব। কারণ, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, সরকারে থাকা কিছু মানুষের জন্য নয়।” তিনি বাংলাদেশে অবিলম্বে সবধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি সহায়তার আহ্বান জানান।
একই দিনে ঢাকার ১৪টি শক্তিশালী বিদেশি মিশন, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অন্তর্ভুক্ত ছিল। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের কাছে এক যৌথ চিঠি পাঠিয়ে দেশে অব্যাহত প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪০ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ককে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশে চলমান ছাত্র নিধন বন্ধে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপর অনুরোধ জানান।
কারফিউয়ের কঠোরতা ও রাজনীতিতে সংঘাতের সুর
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তখন সেনা মোতায়েন ও কারফিউ শিথিলের খেলা চলছিল। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য বিশেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে সিএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি-পিআর) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় জারিকৃত কারফিউ শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। তবে এদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১৪ ঘণ্টা বিরতি দিয়ে পুনরায় কারফিউ বলবৎ হবে।’ রাজধানী ঢাকায় অফিসে কাজের সময়সীমা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হয় এবং বিকেল ৫টার পরই শুরু হয় সেনাবাহিনীর সশস্ত্র টহল।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন বইছিল বাকযুদ্ধের ঝড়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পঙ্গু হাসপাতাল ও ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শনে যান এবং তার দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ক্ষয়ক্ষতির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ স্টেশন একবছরের মধ্যে সচল করা অসম্ভব।’ অন্যদিকে বিরোধীদল বিএনপি এবং বামপন্থী জোটগুলো নুরুল হক নুরের মতো জননেতাদের গভীর রাতে গ্রেফতার ও সমন্বয়কদের আটক করার ঘটনাকে ‘মধ্যযুগীয় দমননীতি’ বলে অ্যাখ্যা দিয়ে সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করে।
অবশেষে পতন ও মুক্তির ইতিহাস
দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যে আন্দোলন কীভাবে দাবানলে রূপ নেয়, জুলাইয়ের সেই দিনগুলো তার রক্তক্ষয়ী প্রমাণ। সমন্বয়কদের গোয়েন্দা কার্যালয়ে তুলে নিয়ে, কিংবা রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে মুখ চেপে ধরে যে কণ্ঠ রোধ করতে চেয়েছিল তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী; তা শেষ পর্যন্ত আর চেপে রাখা যায়নি। বন্দুকের গুলি, টিয়ারশেল, আর সাউন্ড গ্রেনেডের গর্জনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লাখ লাখ ছাত্র-জনতা নামেন রাজপথে। ইতিহাস সেখানে সাক্ষী দিয়েছিল,দমনপীড়ন দিয়ে সাময়িক বাধা তৈরি করা যায়, কিন্তু কোনো তরুণের বুকে চেপে বসা মুক্তির স্বপ্নকে বুলেট দিয়ে স্তব্ধ করা যায় না। সেই রক্তের পথ ধরেই শেষ পর্যন্ত এসেছিল নতুন এক সূর্য।