ঢাকা: বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ইতিহাসে মতপার্থক্য, ভাঙন ও দলত্যাগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিশেষ করে ২০০১ সালের পর থেকে এবং ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট ও পরবর্তী ১/১১-পর্বকে কেন্দ্র করে দলের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বিএনপি ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন বা অন্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন। কেউ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ার চেষ্টা করেছেন, কেউ জোট রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন, আবার কেউ ধীরে ধীরে মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন।
প্রায় দুই দশক পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, বিএনপি ছেড়ে যাওয়া বেশিরভাগ নেতাই নিজ নিজ রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে বিএনপির সমতুল্য কোনো রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলতেও সক্ষম হননি। বরং, তাদের অনেকেই এখন প্রান্তিক রাজনীতিতে অবস্থান করছেন। তবে তাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক যাত্রা ও প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।
এই ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে তুলে ধরা হলো বিএনপির প্রথম বড় ভাঙনের পটভূমি, সেই ভাঙনের প্রধান মুখ এবং তাদের রাজনৈতিক পথচলা ও বর্তমান অবস্থান।
১/১১-এর আগেই শুরু হয়েছিল অস্বস্তি
২০০৬ সালের শেষ দিকে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা দ্রুত বাড়তে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। এই সময় বিএনপির অভ্যন্তরেও নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দল পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সময় থেকেই দলে ‘একক নেতৃত্ব’ ও ‘সম্মিলিত নেতৃত্ব’ নিয়ে বিতর্ক প্রকট হয়ে ওঠে। যদিও প্রকাশ্যে খুব কম নেতাই মুখ খুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই মতপার্থক্যের ধারাবাহিকতায় একাধিক নেতা দল ছেড়ে বেরিয়ে যান।
প্রথম বড় ধাক্কা: বদরুদ্দোজা চৌধুরী
বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা, সাবেক মহাসচিব এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন দলের অন্যতম গ্রহণযোগ্য মুখ। ২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি নিজেকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে উপস্থাপন করেন। সে সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে না যাওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। পরে দলীয় বিরোধের প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হন।
রাষ্ট্রপতির পদ হারানোর পর বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি দল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং ২০০৪ সালে বিকল্পধারা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও তিনি বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির কার্যকর বিকল্প গড়ে তুলতে পারেননি। একসময় জাতীয় রাজনীতিতে আলোচিত এই নেতার রাজনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতি টেনে তিনি ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।
অলি আহমদের নতুন পথচলা
সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অলি আহমদ ছিলেন বিএনপির আরেক প্রভাবশালী নেতা। দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তিনি বিএনপি ছেড়ে প্রতিষ্ঠা করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। শুরুর দিকে এলডিপিকে বিএনপির একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে দলটি কখনোই উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক বিস্তার ঘটাতে পারেনি। কয়েকটি নির্বাচনে অংশ নিলেও জাতীয় রাজনীতিতে এলডিপি প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় ঐক্য থেকে তার ছেলেকে মনোনয়ন দিলেও তিনি পরাজিত হন। অলি আহমদ এখন জামায়াতকে আঁকড়ে ধরে রাজনীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা
বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা দীর্ঘদিন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি তথ্য, যোগাযোগসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তবে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্য ও সাংগঠনিক বিরোধের জেরে ২০১০ সালে তিনি বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করলেও জাতীয় রাজনীতিতে সেটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট ও উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বিএনপি ছাড়ার পর তার রাজনৈতিক অবস্থান আর আগের মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান।
শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমুর আলম খন্দকার
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমুর আলম খন্দকার একসময় দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০১৫ সালে দীর্ঘ কারাবাসের পর শমসের মবিন চৌধুরী বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, ২০২২ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তৈমুর আলম খন্দকার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন।
পরে দুজনই তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দেন। শমসের মবিন দলটির চেয়ারম্যান এবং তৈমুর আলম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের নেতৃত্বেই তৃণমূল বিএনপি শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। তবে নির্বাচনে দলটি উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৃণমূল বিএনপিও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। একই বছরের অক্টোবরে একটি মামলায় গ্রেফতার হয়ে কয়েক মাস কারাগারে ছিলেন শমসের মবিন চৌধুরী। পরে জামিনে মুক্তি পেলেও তাকে আর প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় দেখা যায়নি। বর্তমানে তিনি কার্যত আড়ালেই রয়েছেন। অন্যদিকে, তৈমুর আলম খন্দকারকেও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় দেখা যায়নি। বর্তমানে তিনিও মূলধারার রাজনীতিতে কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।
‘বিকল্প’ রাজনৈতিক শক্তির সীমাবদ্ধতা
বিএনপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া নেতাদের একটি বড় অংশের ধারণা ছিল, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়া সম্ভব হবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বড় রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসা অধিকাংশ নেতাই সংগঠন, তৃণমূল নেটওয়ার্ক এবং নিবেদিত কর্মীবাহিনীর অভাবে টেকসই অবস্থান গড়তে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রেই দল প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছরের মধ্যে তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ে।
বিএনপি কি দুর্বল হয়েছিল?
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, প্রতিষ্ঠাকালীন কয়েকজন নেতার বিদায় বিএনপির জন্য অবশ্যই একটি সাংগঠনিক ধাক্কা ছিল। বিশেষ করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়।
তবে অন্যদের মতে, দলটি সাংগঠনিকভাবে ভেঙে পড়েনি। বরং দলটি পরবর্তী সময়ে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সাংগঠনিক পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয় এবং দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে।
দুই দশক পরের চিত্র
দুই দশক পরে দেখা যায়, বিএনপি ছেড়ে যাওয়া অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতার রাজনৈতিক প্রভাব আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। কেউ নিজ দলের সীমিত পরিসরে সক্রিয়, কেউ জোট রাজনীতির অংশ, আবার কেউ কার্যত রাজনীতির মূলধারা থেকে দূরে।
অন্যদিকে বিএনপি নানা রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন এবং সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে একটি প্রশ্ন আজও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত—দল ছেড়ে যাওয়া নেতারা কি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নাকি সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাই তাদের সেই পথে যেতে বাধ্য করেছিল? এর উত্তর একরৈখিক নয়; প্রত্যেক নেতার অভিজ্ঞতা, অর্জন ও সীমাবদ্ধতা ভিন্ন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিএনপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা গড়ার স্বপ্ন যতটা সহজ মনে হয়েছিল, বাস্তবে তার পথ ছিল অনেক বেশি কঠিন।
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, এমপি সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে দল অতীতেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। তবে বিএনপির মতো বড় দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে কেউ উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছেন—এমন নজির গত দুই দশকে দেখা যায়নি। সামনের দিনেও পারবে বলে মনে হয় না।’