Saturday 01 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ডাক্তারদের টেস্ট ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৯ জুলাই ২০২৬ ১৭:৪৪ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ ১৯:০০

– ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা:  ডাক্তারদের টেস্ট ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করার উদ্যোগের কথা জানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব ফেলে রেখে বাইরে পাশের ক্লিনিক খোলাবেন, সরকারি দায়িত্ব রেখে সেখানে সার্জারি করবেন আর কমিশন খাবেন, রোগী আসলে বলবেন পাশের ক্লিনিকে গিয়ে টেস্ট করতে- এসব বন্ধ করতে হবে। এগুলো মনিটর করা হবে।

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। যৌথভাবে গবেষণাটি করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেন্ট রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক বাজেট ব্যবহারের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত অর্থ থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও মাত্র ১১ শতাংশ আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই ফলাফল থেকে প্রতীয়মান হয় যে উত্তরদাতাদের দৃষ্টিতে অব্যয়িত অর্থের প্রধান কারণ আর্থিক অনিয়মের চেয়ে বাজেট ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। বিশেষ করে যেসব পরিচালন খাতে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেসব খাতে ব্যয় ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সাধারণ সরঞ্জাম খাতে বরাদ্দের মাত্র ২৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ভ্রমণ ও স্থানান্তরসংক্রান্ত খাতে ব্যয়ের হার ছিল ৬৮ শতাংশ এবং পেশাগত সেবা ও সম্মানী খাতে ৫৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে।

টেন্ডার প্রক্রিয়ার অনিয়মের বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, পছন্দের লোককে কাজ দিতে টেন্ডারে এমন অবাস্তব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। যেমন—পাঁচ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার ট্রানজেকশনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া কয়জন ব্যবসায়ী এই শর্ত পূরণ করতে পারবে? এটি করা হয় মূলত প্রতিযোগিতা সীমিত করে পছন্দের পাত্রকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য।

স্বাস্থ্য খাতে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ অপচয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকা দিয়ে দুটি কেনা হয়েছিল। অথচ যেখানে বসানো হয়েছে, সেখানে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। কেন কেনা হয়েছিল? কারণ প্রতি মেশিনে ৪ থেকে ৬ কোটি টাকা লাভ ছিল। যার একটি পড়ে আছে ফরিদপুরে, অন্যটি খুলনায়। একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে কারিগরি লোকবল ছাড়াই এক্স-রে ও অন্যান্য টেকনোলজির সরঞ্জাম কিনে ফেলে রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই।

বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত চার বছরে যেখানে হামের টিকা দেওয়ার কথা ছিল, তারা টিকা সংগ্রহ করেনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। ইউনিসেফ যখন অনুরোধ করেছে, তখনও তারা টিকা কেনেনি। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর যখন হাম দেখা দিয়েছে। বর্তমানে যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তার ৯৯% শতাংশই আনভ্যাক্সিনেটেড। তাই এই টিকাদান কর্মসূচিকে এখন আরও বেগবান করা হয়েছে এবং সম্প্রতি আরও ১ লাখেরও বেশি নতুন শিশুকে এর আওতায় আনা হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ আমল থেকে একটি বিদেশি কোম্পানি চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ডায়ালাইসিসের বাজার দখল করে রেখেছিল। নভেম্বরে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা আর রিনিউ (নবায়ন) করা হবে না। সরকার এখন নিজস্ব উৎস থেকে ডায়ালাইসিস মেশিন কেনা কিনবে। ফলে আগামী ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে এবং অত্যন্ত কম খরচে সাধারণ মানুষ ডায়ালাইসিস সেবা পাবে। এছাড়া প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালু করা হচ্ছে।

দেশের নারী ও সাধারণ মানুষের স্তন ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার এবং ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মানুষের অসচেতনতার বিষয়টি উল্লেখ করে যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন এবং এআই সমৃদ্ধ ‘কিট বক্স’ প্রদান করা হবে। এটি আগামী তিন মাসের মধ্যে শুরু হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে দৈহিক মাপ (উচ্চতা, ওজন), ডায়াবেটিস, রক্তচাপ (হাই প্রেসার) এবং মেশিনের সাহায্যে রক্তের লিপিড প্রোফাইল, আরবিসি ও সিবিসি টেস্ট করবেন। পুরুষদের কাছে পুরুষকর্মী এবং নারীদের কাছে নারী কর্মী যাবেন।

মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাজে অডিটের নামে এক টাকাও ঘুষ দেওয়া যাবে না। সৎ থাকলে কাউকেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাকে কেউ ভয় দেখাতে পারবে না, জেলে নিতে পারবে না। আপনি যদি সৎ হন, অডিটে অনৈতিক টাকা চাইলেই দেওয়া বন্ধ করুন এবং সরাসরি আমার কাছে আসুন। পরিস্থিতি যা-ই হোক, আমি নিজে তা ফেস করব।

হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির হার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, হাসপাতালে সন্তানসম্ভবা মা এলে পরিবারকে ভয় দেখিয়ে (যেমন-সিজার না করলে মা বা বাচ্চা মারা যেতে পারে) সিজারিয়ান অপারেশনে বাধ্য করার যে প্রতারণামূলক ব্যবসা চলছে, তা বন্ধে কঠোর তদারকি শুরু হয়েছে। সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সারাদেশে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে সারপ্রাইজ ভিজিট ও তদারকি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী লেবার রুম, লেবার চেয়ার কিংবা নবজাতককে হিট দেওয়ার ন্যূনতম আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই অপারেশন চালিয়ে যাওয়া অনেক ক্লিনিক ইতিমধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক। গবেষণাটি দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত হয়। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। এ ছাড়া ৯৫ জন কর্মকর্তার জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত চর্চা বিষয়ে একটি জরিপ পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপক, জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সরবরাহকারী, শিক্ষাবিদ ও রোগীদের সঙ্গে আরও ৩২টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে অন্যানের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর