ঢাকা: একগুচ্ছ সংস্কার এনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সোমবার (১০ আগস্ট) নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহেমদ গণমাধ্যমকে বলেন, স্থানীয় সরকারের ৫ স্তরের নির্বাচনের আচরণবিধি ইসির অনুমোদন হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং হলে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
উল্লেখ্য, গত জুনে নতুন আচরণবিধির খসড়া ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়, এ নিয়ে মতামত নেয়াও হযেছে। সব কিছু পযালোচনা করে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
দীর্ঘ এক দশক দলীয়ভাবে ভোটের পর এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হচ্ছে। ২০১৬ সালের আচরণবিধি বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের জন্য এবার নতুন করে নির্বাচন আচরণ বিধিমালা হচ্ছে।
সচিব জানান, খসড়া যেভাবে প্রকাশ হয়েছিল, প্রায় একই রকম রাখা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শব্দগত পরিমার্জন-সংযোজন হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখে পোস্টার বাদ দিয়ে প্রচারণার বাকি বিষয়গুলো রাখা হয়েছে। ডিজিটাল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ থাকলেও এআই এর অপব্যবহার রোধে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আচরণবিধিতে যা যা রয়েছে-
পোস্টারবিহীন এ সব নির্বাচনে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুনের পাশাপাশি প্রথমবারে মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও ইউপি ভোটে প্রতি ওয়ার্ডে নির্ধারিত পরিমাপে একটি করে; উপজেলা ভোটে সর্বোচ্চ ২০টি এবং জেলা পরিষদে প্রতি থানা/উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
সরকারিগুরুত্বপূর্ণ পদের সংজ্ঞায় অন্যদের সঙ্গে মেয়রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সিটি, উপজেলা, পৌর, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের ভোটে প্রচারণায় অংশ নিতে মানা করা হয়েছে।
ডিজিটাল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের সুযোগ রাখার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এর অপব্যবহার নিষেধ করা হয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় প্রচারণার খরচও দেখাতে হবে নির্বাচনী ব্যয়ে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে জরিমানা বাড়িয়ে সবক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
মাইকে প্রচারের সময় বেলা ১২ থেকে সন্ধ্যা পযন্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এসময়ে ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমান বাহনেও প্রচারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ভোটের সময় নির্বাচন পরিচালনা কাজে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সার্কিট হাইজ, রেস্ট হাইজ ও ডাক বাংলো ব্যবহারে অগ্রাধিকারের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে সব আচরণবিধিতে।
নির্বাচনে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুনের পাশাপাশি বিলবোর্ডের আকার-আয়তন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে । প্রচার সামগ্রী হবে সাদাকালো রঙের। ভোটের প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ রয়েছে।
ব্যানার- আয়তনে সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট।
লিফলেট, হ্যান্ডবিল এ ফোর সাইজের (৮.২৭ ইঞ্চি বাই ১১.৬৯ ইঞ্চি)।
ফেস্টুন ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি।
বিলবোর্ড এর আয়তন সর্বোচ্চ ১৬ ফুট বাই ৯ ফুটের মধ্যে হতে হবে।
প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্ত, উচ্চতা ৬ ফুটের বেশি নয়। জীবন্ত প্রাণী প্রচারণায় ব্যবহার করা যাবে না।
ফেস্টুন, হ্যান্ডবিলে মুদ্রণের তারিখবিহীন, পলিথিনের আবরণ, পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না। প্রার্থীর নিজের ছবি, প্রতীক ছাড়া অন্য কিছু থাকবে না প্রচার সামগ্রীতে।
ইউপি আচরণবিধিতে নতুন যা-
২০১৬ সালের আচরণবিধি বাদ দিয়ে এবার নতুন করে ইউপি নির্বাচন আচরণ বিধিমালা হচ্ছে।
প্রচারণায় অংশ না নিতে সরকারি অতিগুরুত্বপূর্ণ তালিকায় মেয়রের সঙ্গে মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের (দলীয় প্রশাসক নিয়োগ হল এবার) অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা স্থানীয় সরকার পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভোটের প্রচারণায় থাকতে পারবে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণার ব্যয়ও নির্বাচনী ব্যয়সীমার মধ্যে যুক্ত হবে।
প্রচারণায় মাইকের ব্যবহার বিষয়ে বেলা ২ টার আগে এবং রাত ৮ টার পরে বারণ ছিল। ছয় ঘণ্টা মাইক বা শব্দবর্ধনকারী যন্ত্রের ব্যবহার করা যেত। এবারও ছয় ঘণ্টা রেখেছে মাইকের ব্যবহার; সেক্ষেত্রে বেলা ১২ টা থেকে সন্ধ্যার আগেই শেষ করতে হবে।
আগে বিলবোর্ড ব্যবহারই নিষিদ্ধ ছিল। এবার প্রতি ওয়ার্ডে বিলবোর্ডের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
প্রতি ওয়ার্ডে একটির বেশি বিলবোর্ড নয়।
প্রচারে একের বেশি মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না।
বেলা ১২ টার আগে ও সূযাস্তের পর মাইকে প্রচারণা চালানো যাবে না।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানা ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এবার ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
এছাড়া প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতার বিধানটি বিধিতে যুক্ত করা হয়েছে এবার।
উপজেলায় যা আছে-
উপজেলায় ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড এর সাইজের ব্যবহার একই ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট রয়েছে। ইউনিয়ন প্রতি একটি, পৌরসভার প্রতি ওয়ার্ডে একটি; পুরো উপজেলায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
এবার নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপনে সীমিত করা হয়েছে। উপজেলা ভোটে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি, প্রতি ইউনিয়নে একটি এবং পৌরসভা এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডের একটির বেশি ক্যাম্প হবে না।
আগে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি নির্বাচনী ক্যাম্প করতে পারতেন।
পৌরসভায় নতুন
এখানে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যহার করা যাবে। মাইকে ও ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমান বাহনে বেলা বারো টা থেকে সূযাস্ত পযন্ত প্রচারণা চালানো যাবে।
জেলা পরিষদে নতুন
প্রতি থানা/উপজেলা একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন প্রার্থী। জেলা পরিষদের নির্বাচনে মাইকের ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন
সিটির প্রতি ওয়ার্ডে একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না প্রার্থী। নির্বাচনী ক্যাম্প আগের মতোই প্রতি থানায় একটি করে থাকতে পারবে মেয়রের।
আইন সংশোধন করে ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রতীকে ভোট করার বিধান চালু হয়। সে অনুযায়ী আচরণবিধিও করা হয়।
এ সময় ইউপিতে চেয়ারম্যান, উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান; পৌরসভায় মেয়র, সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ভোট দলীয় প্রতীকে হয়।
ইউপি সদস্য, উপজেলায় মহিলা সদস্য, পৌরসভার কাউন্সিলর, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদ নির্দলীয়ভাবে হয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এএমএম নাসির উদ্দন কমিশন গণিপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংস্কার আনা হয়, সেই সঙ্গে আচরণবিধিতে। এ ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকারেও সংস্কার আনা হচ্ছে।
স্থানীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত আচরণবিধি ভেটিংয়র জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে
সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১০ আগস্ট ২০২৬ ১৯:২৪
১০ আগস্ট ২০২৬ ১৯:২৪
সারাবাংলা/এনএল/এসআর