রাজশাহী: ঢাকা-রাজশাহী রুটে বিমানের ফ্লাইট সংকট, টিকেটের দুষ্প্রাপ্যতা ও চড়া দামে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। কখনো কখনো টিকেট মূল্য ঠেকছে প্রায় ১৮ হাজারে। অন্যদিকে সিভিল এভিয়েশন অথোরিটির কার্যকারী কোনো উদ্যাগ না থাকায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার নেই কোনো নিশ্চয়তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নভোএয়ারের হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ এবং এয়ারলাইন্সগুলোর কৃত্রিম সিট সংকট তৈরি করে বেশি মুনাফা লোটার কারণেই নাকাল হচ্ছেন সাধারণ যাত্রী, পর্যটক এবং জরুরি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাতায়াত করা রোগীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে এয়ারলাইন্সগুলোর ভাড়া বাড়ানোর প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। পূর্বে ইকোনমি ক্লাসের সর্বনিম্ন ভাড়া তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা এবং অন্যান্য ক্লাসের জন্য চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা আকাশচুম্বী। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ইকোনমি ক্লাসের সর্বনিম্ন ভাড়া এখন পাঁচ হাজার ৭৪৯ টাকা, ইকোনমি সেভার ছয় হাজার ৫৪৯ টাকা, ইকোনমি ভ্যালু আট হাজার ৭৪৯ টাকা এবং ইকোনমি ফ্লেক্স ক্যাটাগরির টিকিট বিক্রি হচ্ছে ১১ হাজার ৫৪৯ টাকায়। জরুরি বা পিক টাইমে শেষ মুহূর্তের টিকিট তো আট হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠছে। নভোএয়ার এই রুটে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পর থেকেই মূলত এ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এবং রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
বর্তমানে ইউএস-বাংলা দৈনিক দুটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে; ঢাকা থেকে সকাল ৭টা ১৫ ও বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে এবং রাজশাহী থেকে সকাল ৮টা ৩৫ ও সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে বিমান চলাচল করে। অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সপ্তাহে মাত্র তিন দিন- সোমবার, বুধবার ও শনিবার ফ্লাইট চালাচ্ছে। সোমবার ও বুধবার ঢাকা থেকে সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে রাজশাহী পৌঁছায় এবং রাজশাহী থেকে সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ছেড়ে বেলা ১১টা ৫ মিনিটে ঢাকা অবতরণ করে। শনিবার এ ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে ছেড়ে বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে রাজশাহী পৌঁছায় এবং ফিরতি পথে সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে রওনা হয়ে সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছে। প্রতিযোগী কমে যাওয়ার সুবাদে তৈরি হওয়া একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে যাত্রীদের এখন আর হুট করে বিমানবন্দরে গিয়ে টিকিট পাওয়ার সুযোগ নেই, ভ্রমণ নিশ্চিত করতে অন্তত এক সপ্তাহ আগে বুকিং দিতে হচ্ছে।
এই রুটে যাত্রীর কোনো ঘাটতি নেই। চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, সিল্ক ব্যবসা এবং ঐতিহ্যবাহী পর্যটনকে কেন্দ্র করে ঢাকা-রাজশাহী রুটে প্রতিদিন শত শত যাত্রী যাতায়াত করতে চান। তবুও এই সংকটকে কৃত্রিম হিসাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা-রাজশাহী রুটের নিয়মিত বিমানযাত্রী আবুল কালাম আজাদের বলেন, ‘রাজশাহীতে যাত্রীর অভাব নেই। সকালে তিনটি, দুপুরে ও বিকেলে তিনটি করে মোট ছয়টি ফ্লাইট দিলেও প্রতিটির সিট ফুল থাকবে। অথচ সিট সংকটের কারণে নিরুপায় মানুষ, বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগীদের আট হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে টিকিট কিনতে হচ্ছে।’
তিনি কক্সবাজার রুটের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে প্রতিযোগিতা ও পর্যাপ্ত ফ্লাইট থাকার কারণে অনেক সময় ৪,৩০০ টাকায়ও টিকিট পাওয়া যায়। অথচ রাজশাহীতে প্রতিযোগী কমে যাওয়ায় এয়ারলাইন্সগুলো কৃত্রিম সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। পরিবেশ ও স্থানীয় টেকসই পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব একদিকে শাহ মখদুম বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা ও সংযোগ বিমানভাড়ার কারণে সীমিত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে উত্তরবঙ্গের পর্যটন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর। আকাশপথ নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় বিশাল সংখ্যক ভ্রমণকারী দীর্ঘ ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার সড়ক বা ট্রেন যাত্রার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে মহাসড়কে অতিরিক্ত দূরপাল্লার বাস চলাচলের কারণে কার্বন নিঃসরণ এবং শব্দদূষণ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন,পাশাপাশি রাজশাহী, পুঠিয়া রাজবাড়ি কিংবা বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে যেসব উচ্চমানের পর্যটক বা বিদেশি গবেষক অল্প সময়ে এসে ইকো-ট্যুরিজম উপভোগ করতে চান, অতিরিক্ত সময় ও আকাশছোঁয়া ভাড়ার কারণে তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে না পেরে রাজশাহী অঞ্চলের জটিল রোগীরা সঠিক সময়ে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
একই সঙ্গে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (সিএএবি) এয়ারলাইন্সগুলোর অন্যায্য মুনাফা লোটার মানসিকতা বন্ধে অবিলম্বে সর্বোচ্চ ভাড়ার সীমা বা প্রাইস ক্যাপ নির্ধারণ করে কার্যকরী নির্দেশিকা জারি করতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যটন খাতকে গতিশীল করতে এয়ারলাইন্স ও স্থানীয় পর্যটন বোর্ড যৌথভাবে তরুণ ট্রাভেলার ও ব্যাকপ্যাকারদের জন্য সাশ্রয়ী অফ-পিক ট্রাভেল প্যাকেজ চালু করতে পারে। সঠিক তদারকি ও কার্যকর উদ্যোগ থাকলে মাত্র এক ঘণ্টার এ আকাশপথ উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি, পরিবেশ ও পর্যটন খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
রাজশাহী-ঢাকা রুটের বিমান ভাড়া বৃদ্ধি এবং ফ্লাইট সংকট নিয়ে ডা. আলমগীর হোসেনের বলেন, আগের চেয়ে ভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। আগে একটা সময় আমরা তিন হাজার টাকায় যাতায়াত করেছি। এখন তো সেটা প্রায় ৫৭০০ কখনো ৬০০০ হয়ে যায় এক সপ্তাহ আগে কাটতে হয় এই হচ্ছে অবস্থা।
শাহ মখদুম বিমানবন্দর রাজশাহীর বন্দর ব্যবস্থাপক মোছা. দিলারা পারভীন এ বিষয়ে বলেন, ‘আমার জানা মতে নভোএয়ার নিজেদের ফ্লাইট গুটিয়ে নিয়েছিল। এরপর থেকে ফ্লাইট সংখ্যা কম হওয়ায় যাত্রীদের চাপ ও টিকেটের চাহিদা বাড়ায় দাম বেড়েছে। কিন্তু দাম বাড়া না বাড়া এগুলো আমাদের হাতে কিছু থাকে না।’
ভোগান্তি নিরসনে কোনো পরিকল্পনা আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো বিমান এই লাইনে আসতে চাইলে আমরা অনুমোদনের বিষয়টি দেখতে পারব। নতুন করে কোনো বিমান কোম্পানি আসতে চাই কিনা কিংবা সংযুক্ত করতে সিভিল এভিয়েশন অথোরিটির কোনো পরিকল্পনা করছে বলে আমার জানা নেই।’