Sunday 06 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

সালমান শাহ’র মৃত্যু রহস্য: ৩০ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

তাহমিনা ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:৩৮

প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহ -ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও আজও শেষ হয়নি রহস্যের জট। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। প্রথমে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হলেও সময়ের সঙ্গে এটি দেশের অন্যতম আলোচিত আইনি মামলায় পরিণত হয়েছে।

আজ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলেও মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। একাধিক তদন্ত সংস্থা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিলেও সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

তিন দশকের তদন্তের পথচলা

বিজ্ঞাপন

সালমান শাহর মৃত্যুর পর ১৯৯৭ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে পরিবার আদালতে রিভিশন আবেদন করে।

এরপর ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। প্রায় ১১ বছর পর ২০১৪ সালে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে ঘটনাকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাতেও সন্তুষ্ট হয়নি পরিবার।

২০১৬ সালে আদালতের নির্দেশে নতুন করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালে পিবিআই জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নানা কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তবে ওই প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী আদালতে নারাজি আবেদন করেন।

হত্যা মামলা হিসেবে নতুন মোড়

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালত ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরদিন রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।

তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় কয়েক দফা পিছিয়েছে। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। আদালত নতুন করে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারণ করেছেন।

সালমান শাহ’র সাবেক স্ত্রী সামিরা, সালমান শাহ ও অভিযুক্ত আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন – সংগৃহীত কোলাজ ছবি

ডন গ্রেফতারের পর নতুন আলোচনা

চলতি বছরের ৯ আগস্ট দীর্ঘদিন পলাতক থাকা মামলার আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন-কে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালত তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান।

তদন্ত সংস্থার দাবি, ডন-কে জিজ্ঞাসাবাদে সালমান শাহ’র মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য, অন্য আসামিদের ভূমিকা এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে ডন আদালতে দাবি করেন, তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করবেন।

পুরোনো তদন্ত বনাম নতুন অভিযোগ

সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে বর্তমানে দুটি বিপরীত অবস্থান রয়েছে।

একদিকে সিআইডি ও পিবিআইয়ের আগের তদন্তে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে পারিবারিক কলহ, মানসিক চাপ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক টানাপোড়েনকে আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, আগের তদন্তগুলো নিরপেক্ষ হয়নি এবং প্রকৃত অপরাধীরা এখনো বিচারের মুখোমুখি হয়নি।

পুরোনো নথি ও জবানবন্দি যাচাই

বর্তমান তদন্তে আগের সব তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের নথি, আলামত এবং বিভিন্ন সময়ে নেওয়া জবানবন্দি পুনরায় যাচাই করছে সিআইডি।

ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, কোনো জবানবন্দিতে একটি বক্তব্য থাকলেই সেটি আদালতে সত্য প্রমাণিত হয় না। বর্তমান তদন্তে প্রতিটি তথ্য আলামত ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হবে।

আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহবুবের মতে, প্রায় তিন দশক পুরোনো একটি মামলার তদন্ত শেষ করতে সময় লাগার অন্যতম কারণ হলো পুরোনো নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নতুন তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে দেখা। আগের তদন্তের সঙ্গে বর্তমান অভিযোগের পার্থক্য থাকায় তদন্তকারী সংস্থাকে প্রতিটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।

ভক্তদের প্রত্যাশা

ডনের রিমান্ড শুনানির দিন আদালত প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন সালমান শাহর ভক্তরা। তাদের দাবি, ৩০ বছর পর হলেও প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে হবে এবং যারা দায়ী, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে মামলার বাদী ও সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যার হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি নিয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সঠিক তদন্তের অপেক্ষায়

তিন দশক ধরে চলা তদন্ত, আদালতের একাধিক নির্দেশ, ভিন্নমুখী প্রতিবেদন এবং নতুন করে দায়ের হওয়া হত্যা মামলার কারণে সালমান শাহর মৃত্যু এখন শুধু একটি অপমৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি মামলাগুলোর একটি।

মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলেও আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো মেলেনি। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ার কথা রয়েছে। সেই প্রতিবেদনেই বহুল আলোচিত এই মামলার তদন্ত নতুন কোনো মোড় নেয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশবাসী।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর