রাজশাহী: রাজশাহীর প্রশস্ত ও আলোক সজ্জিত সড়কগুলো ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। গত এক বছরে শিক্ষার্থীর সড়কে ১৬৯ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৬০ জন। এসব দুর্ঘটনায় ট্রাক ও বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল অনেকাংশে দায়ী। তবে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ট্রাক নয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন অমান্য, অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং দুর্বল তদারকির কারণেই প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ।
গত মে মাসের ৫ তারিখ রাজশাহীর এক ঘটনা আলোচিত হয় সারা দেশে। রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ এলাকায় একটি ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় এক দোকানি নিহত হন। দুর্ঘটনার পর এলাকাজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনতা দুটি ডাম্প ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই ডাম্প ট্রাকগুলো অতিরিক্ত গতিতে এবং নিয়ম না মেনে চলাচল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এটি কোনো একক ঘটনা ছিল না। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি একই মহাসড়কের ঝলমলিয়া বাজারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বালুবাহী ট্রাক বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন এবং আহত হন আরও কয়েকজন। ব্যস্ত বাজারে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২৬ জানুয়ারি বেলপুকুর এলাকায় একটি বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনজন। বছরের শুরু থেকেই ধারাবাহিক এসব দুর্ঘটনা রাজশাহীর সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজশাহী জেলা পুলিশ ও মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় ১৩৫টি এবং মহানগরে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মোট ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১৬৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এছাড়া প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ট্রাক বা ডাম্প ট্রাকের কারণে। ফলে দুর্ঘটনার জন্য কেবল একটি নির্দিষ্ট যানবাহনকে দায়ী না করে সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার দাবি উঠছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত গতি ও ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। অনেক চালকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স নেই। অনেক যানবাহনের ফিটনেসের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ করে ডাম্প ট্রাক নিয়ে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক ডাম্প ট্রাক ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বালু বা মাটি বহন করে। এতে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ব্রেক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। আবার অধিকাংশ ট্রাকে বালু বা মাটি ঢেকে রাখার জন্য কোনো সুরক্ষা কভার ব্যবহার করা হয় না। ফলে চলন্ত অবস্থায় ধুলাবালি উড়ে অন্য যানবাহনের চালকদের দৃষ্টিসীমা কমিয়ে দেয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডাম্প ট্রাকের চালকদের অনেকেই বেপরোয়া গতিতে যান চালান। তারা ওভারটেকিংয়ের সময় কোনো নিয়ম মানেন না। দিনের পাশাপাশি রাতেও একইভাবে দ্রুতগতিতে চলাচল করায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। অনেক মোটরসাইকেল চালকও অভিযোগ করেন, ডাম্প ট্রাকের ধুলাবালি ও বেপরোয়া গতির কারণে তারা একাধিকবার দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন।
অন্যদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, দুর্ঘটনার জন্য শুধু ডাম্প ট্রাককে দায়ী করা ঠিক হবে না। তাদের দাবি, বাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহনই দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই যানবাহনে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুর করা আইনসম্মত নয়। প্রতিটি দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পুলিশ জানিয়েছে, ডাম্প ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনের কাগজপত্র, ফিটনেস, চালকের লাইসেন্স এবং অতিরিক্ত মালামাল বহনের বিষয়গুলো তদারকি করা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভাও করা হচ্ছে। তবুও দুর্ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মামলা বা অভিযান দিয়ে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। এজন্য চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, ওভারলোডিং বন্ধ করা, ডাম্প ট্রাকে বাধ্যতামূলকভাবে সুরক্ষা কভার ব্যবহার নিশ্চিত করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
এদিকে রাজশাহীতে বর্তমানে ৮৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৪৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে। সড়কের পরিমাণের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা সেই হারে উন্নত হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আলামিন সরকার টিটু বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কারণ দায়ী। মহাসড়কে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভটভটির জন্য সরকার আলাদা লেন বা সড়ক নির্মাণ না করায় এসব যানবাহন অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে। এসব চালকের অনেকেরই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নেই। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া মহাসড়কের পাশে সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা ও হাটবাজার গড়ে ওঠায় সড়ক সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
তিনি আরও বলেন, দেশে অদক্ষ চালকের সংখ্যা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চালকের পরিবর্তে হেলপারকে দিয়ে গাড়ি চালানো হয়। এছাড়া বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং অতিরিক্ত মালামাল বহনের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁর মতে, মহাসড়কগুলো ধাপে ধাপে চার লেনে উন্নীত করা এবং ইজিবাইক ও অটোরিকশার জন্য পৃথক লেন বা সড়কের ব্যবস্থা করা হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে উল্লেখ করে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ বলেন, যেখানে প্রশস্ত সড়ক প্রয়োজন, সেখানে এখনো পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। যেসব স্থানে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, সেগুলোর অধিকাংশই এক লেনের সড়ক। এছাড়া চালকদের অসাবধানতা এবং বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব। ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে পারলেই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, রাজশাহীর সড়কগুলো অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর উপযোগী নয়। তাই গতি নিয়ন্ত্রণ করে গাড়ি চালানো উচিত। এসব সড়কে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগ নিরাপদ। এর বেশি গতিতে চললে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সরকারের কার্যকর উদ্যোগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
রাজশাহী মেট্রোপলিটনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ সাধারণ মানুষের পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব। পাশাপাশি অনেক চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই যানবাহন চালাচ্ছেন। ফলে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “নগরবাসীকে সচেতন করতে আমরা নিয়মিত বিভিন্ন কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে। মোটরসাইকেল, ডাম্প, ট্রাক, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের সম্পৃক্ততায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনা কমাতে চালক ও পথচারী— উভয়ের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে মেনে চলার ওপর গুরুত্ব আমরা গুরুত্ব দেই বলে জানান তিনি।”
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে। ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে কাজ করা হবে। পাশাপাশি বর্তমানে যেসব সড়ক এক লেনের, সেগুলো পর্যায়ক্রমে চার লেন ও ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, একসময় রাজশাহীর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ, যা বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি। তাই সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টায় রাজশাহী মহানগরীকে আরও শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নিরাপদ করে তুলতে আমরা কাজ করছি।