Thursday 03 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মার্কেন্টাইল ব্যাংক / সিএফও তাপস পালের নেতৃত্বে ১২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

আদিল খান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:২৬

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ডিএমডি ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) তাপস চন্দ্র পাল। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে সংঘবদ্ধভাবে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত অভিযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা পড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে অভিযোগের তদন্তও শুরু করেছে তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বরাবর পাঠানো অভিযোগের নথি থেকে জানা যায়, ব্যাংকের ডিএমডি ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) তাপস চন্দ্র পাল ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব ও ব্যয় হিসাব ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন। এ ঘটনায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিউল হাসান, কয়েকজন পরিচালক এবং আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাংকের প্রোভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার, আসবাবপত্র কেনাকাটা এবং বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথির তথ্যানুযায়ী, তাপস চন্দ্র পাল দীর্ঘদিন ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন (এফডিএ) ও সিএফও কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি আর্থিক হিসাব ও বিভিন্ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার ও কারসাজি করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, তাপস চন্দ্র পাল কয়েকজন পরিচালক ও এমডি মতিউল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা সরিয়ে নেন। এই অর্থ কীভাবে, কোন কোন হিসাবে এবং কার স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে তাপস চন্দ্র পালের স্ত্রীর সিঙ্গাপুরে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নেন। সিঙ্গাপুরে ব্যয় করা অর্থের একটি অংশ ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব থেকে পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি স্ত্রীর মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে আনার খরচও ব্যাংকের অর্থে বহন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তার স্ত্রীর চিকিৎসাকালীন ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা সিঙ্গাপুরে যান। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যয়ও ব্যাংকের অর্থ থেকে পরিশোধ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্যক্তিগত চিকিৎসা বা সংশ্লিষ্ট ব্যয় ব্যাংকের অনুমোদিত খাতে না হলে তা আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আরও পড়ুন

মার্কেন্টাইল ব্যাংক / রক্ষকরাই যখন ভক্ষক!

অপরদিকে ব্যাংকের ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার কেনাকাটা, আসবাবপত্র সংগ্রহ এবং সিএসআর ব্যয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দরপত্র, অনুমোদন, প্রকৃত মূল্য এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

একইভাবে প্রোভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অর্থ ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অর্থ কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি পাওনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হবে।

জানা গেছে, তাপস চন্দ্র পাল রূপালী ব্যাংকে কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এরপর দ্রুত ধারাবাহিক পদোন্নতি পান তিনি। তথ্যানুযায়ী, তাপস চন্দ্র পাল ২০১৮ সালে ভিপি, ২০২১ সালে এসভিপি, ২০২২ সালে ইভিপি এবং ২০২৪ সালে এসইভিপি পদে উন্নীত হন তাপস। সর্বশেষ ২০২৬ সালে তিনি ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান। তার এই দ্রুত পদোন্নতির পেছনে কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সিএ, এসিসিএ বা এফসিএর মতো পেশাগত সনদ না থাকার পরও তাপস চন্দ্র পাল ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। দীর্ঘদিন এফডিএ ও সিএফও কার্যালয়ে অবস্থানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি করেছেন।

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ডিএমডি ও সিএফও তাপস চন্দ্র পাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা নিয়ে আমার বলার কিছু নাই। জ্ঞানত এ ধরনের কোনো প্রশ্ন এখন পর্যন্ত আমার কাছে আসেনি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দিস ইজ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এক টাকা নেওয়ার আপনার-আমার, কারও ক্ষমতা নাই। ব্যাংক থেকে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘উইদাউট অ্যানি ডকুমেন্টস, উইদাউট অ্যানি প্রোপার অ্যাপ্রুভাল একপয়সাও এদিক থেকে ওদিকে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা নাই।’ অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাপস চন্দ্র পাল বলেন, ‘আপনার বিবেককে বলেন না। নিজেকে প্রশ্ন করুন— ইজ ইট পসিবল? ব্যাংকের টাকা ইচ্ছামতো নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ আছে?’

তাপস চন্দ্র পাল আরও বলেন, ‘ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও অনুমোদন রয়েছে। এটা আমি আপনাকে বললাম। এখন বাকিটা আপনাদের হাতে। যেহেতু আপনারা জ্ঞানী মানুষ, আপনারা বিবেচনা করুন।’ পদোন্নতির বিষ‌য়ে কিছু কাগজপত্র দে‌খি‌য়ে তি‌নি ব‌লেন, ‘সিএফও হাওয়ার সকল যোগ্যতা আমার আছে। বাংলা‌দেশ ব্যাংক কী পে‌য়ে‌ছে না পে‌য়ে‌ছে আমার জানা নেই।’

এদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সিএফও তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, এর জবাব আমরা ব্যাংক ও তার কাছে চাইব। যদি অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাই, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’

আর বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় মার্কেন্টাইল আর্থিক সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কিছু নিয়ন্ত্রক পরিদর্শকের নীরব সহযোগিতায় অনিয়মগুলো দীর্ঘদিন চলেছে। সেসব বিষ‌য়েও অধিকতর তদন্ত চলছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

আদিল খান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর