Wednesday 02 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার / যুক্তরাষ্ট্র কি ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি নয়’ কৌশলের দিকে যাচ্ছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৩৬ | আপডেট: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৫০

তেহরানের বিলবোর্ডে ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে লাগানো পোস্টার। ছবি আল জাজিরা।

এক মাসের বিরতির পর এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দেশ দুটির মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের একটি নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ইরানের ওপর ‘কঠোর’ আঘাত হানার হুমকি দিয়েছেন। সেই সঙ্গে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল করার জন্য চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।

গত ৩১ আগস্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকে বলেন, ‘আমরা তাদের (ইরান) ওপর কঠোর আঘাত করব। দেশটিকে জবাব দেওয়া হবে।’ এর কিছুক্ষণ আগেই, আগের রাতে (৩০ আগস্ট) ইরানের লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাবে ইরান জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পালটাপালটি হামলায় নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দিলেন ট্রাম্প।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই সংঘাতে ওয়াশিংটন একটি নতুন ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ কৌশলে যেতে পারে, যার লক্ষ্য হলো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে না জড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ইরানের ওপর আঘাত হানা।

ট্রাম্প গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের অর্থ এই নয় যে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হতে চলেছে। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত ভালো অবস্থায় আছে।’ এবং একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন ইরানের আর্থিক ব্যবস্থা, সামরিক বাহিনী এবং নেতৃত্ব অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে আমরা তাদের আঘাত করব না। দেখা যাক কী হয়।’

এর ফলে, যে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা হলো- ট্রাম্পের কৌশলটি এখন ঠিক কী, এবং যুদ্ধ সপ্তম মাসে পদার্পণ করায় মার্কিন সামরিক বাহিনী কি তা বজায় রাখতে পারবে?

ইরানের ওপর ‘কঠোর’ আঘাত হানার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন যুদ্ধ কৌশল কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। এর শুরু হয়েছিল একটি পুরোদস্তুর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যা ৪০ দিন স্থায়ী হয়েছিল, এরপর একটি যুদ্ধবিরতি হয় যা পরে বর্ধিত করা হয়।

জুনে, তেহরান এবং ওয়াশিংটন একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে, যেখানে তারা যুদ্ধবিরতির শর্তাবলীতে সম্মত হয় এবং ৬০ দিনের জন্য বৃহত্তর শান্তি আলোচনার অনুমতি দেয়।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি ভেস্তে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শর্ত লঙ্ঘনের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করে। এর ফলে জুলাই মাসে ইরানের উপর মার্কিন হামলা পুনরায় শুরু হয় এবং তেহরান আবারও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য অবকাঠামোর উপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়।

অতি সম্প্রতি, ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘস্থায়ী সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক চাপের দিকে ঝুঁকেছে। এই পরিবর্তনটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বাহিনীর গোলাবারুদ কমে আসছে। বিশেষ করে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ। তবে, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

গত সপ্তাহে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের অভিযানের ঘোষণা দেন এবং জানান যে এটি বিশ্বজুড়ে দেশটির আর্থিক স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করবে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তেলসহ ইরানের আয়ের উৎসগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। ইরানের তেল বিক্রিতে সহায়তা করছে বলে দাবি করা ৬০টি ‘প্রতিষ্ঠানের’ ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা অন্যান্য দেশ ও সংস্থাগুলোকে গৌণ নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনার হুমকি দিয়েছে।

বেসেন্ট বলেন, ইরানের হামলাগুলো প্রমাণ করে যে তেহরান ‘অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগ্রাসীভাবে পাল্টা আঘাত হানছে।’

এর জবাবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি বলেন, ‘তাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে-এই দাবিটি ভুল। আমি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলছি যে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা আছে।’

হরমুজ প্রণালির কাছে জাহাজ চলাচল করছে।

যুক্তরাষ্ট্র কি ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি নয়’ কৌশলের দিকে যাচ্ছে?

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ক্রমবর্ধমানভাবে একটি অস্থিতিশীল মধ্যম স্থলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হচ্ছে এবং সমাধানগুলোও দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

যদিও উভয় পক্ষই যুদ্ধে অবিলম্বে ফিরে আসার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে উভয়ই প্রমাণ করেছে যে তারা সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত যেন বাকিরা বিশ্বাস করে যে তাদের স্বার্থ হুমকির মুখে পড়েছে।

সোমবার, অ্যাক্সিওস জানিয়েছে যে ট্রাম্প প্রশাসন উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের ট্যাঙ্কার নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইরানকে পর্যায়ক্রমে আক্রমণ করার কৌশল বিবেচনা করছে। ইরানের ওপর সামরিক হামলায় বিক্ষিপ্তভাবে ফিরে আসার পরিকল্পনা ট্রাম্প এখনো অনুমোদন করেননি।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মার্চের শুরুতে হরমুজ প্রণালিকেকে কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়। এখন, উভয় পক্ষই বলছে যে তারা এই জলপথ নিয়ন্ত্রণ করছে।

সমঝোতা স্মারক ভেঙ্গে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের জুলাই মাসে ইরানের ওপর পুনরায় হামলা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে, ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে জড়িত হতে অস্বীকার করে। এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যত প্রশাসন নিয়ে তারা শুধুমাত্র ওমানের সঙ্গে আলোচনা করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পার্সি আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক, অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে সমস্যাটি সমাধান করা ছেড়ে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে এবং এর পরিবর্তে সমস্যাটি পরিচালনা করার জন্য স্থায়ী যুদ্ধের আশ্রয় নিচ্ছে।’

ইরানি নৌবাহিনীর মহড়া চলাকালে একটি জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ছবি: এপি।

ট্রাম্পের নতুন কৌশল কি আদৌ টেকসই?

বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন অনেক কারণ রয়েছে যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে সক্ষম নাও হতে পারে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামি বলেছেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণের জন্য ইরানের সঙ্গে একটি পরিকল্পিত সংঘাতে জড়ানোর চেষ্টা করছে।’

এসলামি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমাদের বিবেচনা করা উচিত যে এই যুদ্ধটি ওয়াশিংটন ডিসির ভুল হিসাবের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। এবং এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের গতিপথ সম্পর্কে তারা তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে খুবই আত্মবিশ্বাসী।’

কিন্তু ঝুঁকি হলো, এই সপ্তাহে ঘটে যাওয়া বিক্ষিপ্ত হামলার মতো ঘটনাগুলো এই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে বলে তিনি আশঙ্কা করেছেন।

ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরান তার অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। ওয়াশিংটন যদি সমঝোতা স্মারকে ফিরে আসে, তেহরানও ফিরবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক চাপকে অগ্রাধিকার দিতে থাকে, তবে ইরান পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘উত্তেজনা প্রশমনের সবচেয়ে সুস্পষ্ট পথ হলো সমঝোতা স্মারকে পারস্পরিক প্রত্যাবর্তন।’

অন্যথায়, তিনি সতর্ক করে বলেন, উভয় পক্ষই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে।

মোর্তাজাভি বলেন, ‘তেহরান [অর্থনৈতিক] চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। উভয় পক্ষই হয়তো বিশ্বাস করে যে তারা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, কিন্তু প্রতিটি নতুন সংঘাত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’

এটাও স্পষ্ট নয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কতদিন ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যেতে পারবে। হামলা যতই অনিয়মিত হোক না কেন এমন জল্পনা রয়েছে যে তাদের গোলাবারুদ কমে আসছে।

এরপর রয়েছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রাম্পের রাজনৈতিক মূল্য। পেট্রোলের উচ্চমূল্য এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে তার ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ায় দেশে তার জনপ্রিয়তা ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর