ঢাকা: ২০ জুলাই ২০২৪। ঢাকাবাসী ঘুম থেকে জেগেছিল এক রুদ্ধশ্বাস, থমথমে নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই নীরবতা স্থায়ী হয়নি বেশিক্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশ মেদিনী কাঁপিয়ে গর্জে ওঠে কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড আর বুলেটের শব্দ। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তাজা রক্তের গন্ধ আর বারুদের ঝাঁঝালো আভাস। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের ইতিহাসে যুক্ত হয় আরও একটি রক্তাক্ত, বিভীষিকাময় অধ্যায়। চিরচেনা ঢাকা শহর রাতারাতি পরিণত হয় এক থমথমে ও শীতল স্নায়ুযুদ্ধের মঞ্চে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের চোখে ছিল অজানা আতঙ্ক আর ক্ষোভের ছাপ।
কারফিউয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, স্থবির দেশ
১৯ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা থেকে প্রথম দফায় জারি হওয়া কারফিউর কড়াকড়িতে স্থবির হয়ে পড়ে পুরো দেশ। ডিএমপির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, আইন অমান্য করলেই মিলবে এক বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। শুক্রবার রাত থেকে শুরু হয়ে শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলা এই কারফিউতে মাত্র দুই ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বেলা ২টা থেকে আবারও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
শুধু কারফিউই নয়, দেশের মানুষকে পুরোপুরি অন্ধকারে রাখতে টানা তৃতীয় দিনের মতো বন্ধ রাখা হয় ইন্টারনেট ও সবধরনের অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থা। জননিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সরকার এক্সপ্রেসওয়ে, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার এবং স্বপ্নের মেট্রোরেল চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া মানুষদের জন্য ডিএমপির কারফিউ পাস বাধ্যতামূলক করা হয়।
এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ ২১ জুলাই থেকে দেশের সব পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। শাটডাউনের কবলে পড়ে বিপণিবিতান ও রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যায়, যা দেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থবিরতার জন্ম দেয়।
রণক্ষেত্র রাজধানী ও সারাদেশে মৃত্যুর মিছিল
কারফিউর বেড়াজাল ভেঙে ২০ জুলাই সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, কাজলা, মিরপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব, মেরুল বাড্ডা ও উত্তরার রাজপথে নেমে আসেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ভাটারা এলাকায় ইউআইইউ, নর্থ সাউথ ও আইইউবির শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের প্রচণ্ড সংঘর্ষ বাধে। ধানমন্ডি, আজিমপুর ও মোহাম্মদপুরের বছিলাতেও বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুরের দিকে উত্তরার আজমপুর রেলগেট এলাকায় শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করেন এবং আজমপুর সেক্টর-৬-এ অবস্থিত হাইওয়ে পুলিশ সদর দফতরে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালান। মিরপুরে দিনভর চলা ধাওয়া-পালটাধাওয়ার মধ্যে মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় সিদ্ধিরগঞ্জের হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি ভবন, যেখানে অগ্নিসংযোগের পর অর্ধশতাধিক দোকানপাট, ব্যাংক ও হাসপাতালসহ ভবনের ভেতরে আটকা পড়া পুলিশ সদস্যদের হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার করে যৌথ বাহিনী।
অন্যদিকে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড ও রেডিও কলোনি এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। দিনশেষে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খবর নিশ্চিত করে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণ, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে দুই পুলিশ সদস্যসহ দেশজুড়ে অন্তত ৩৭ জন প্রাণ হারান, যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই নিহত হন ২৫ জন। এছাড়া সাভার ও ময়মনসিংহে চারজন করে, গাজীপুর ও নরসিংদীতে দুজন করে মানুষের মৃত্যু এই দিনটিকে ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত দিন হিসেবে সাব্যস্ত করে।
মধ্যরাতের রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও দোষারোপের রাজনীতি
যখন রাজপথে তরুণদের রক্ত ঝরছিল, ঠিক তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছিল পালটাপালটি দোষারোপের খেলা। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আন্দোলন এখন আর ছাত্রদের হাতে নেই, বিএনপি-জামায়াত দেশের মানুষকে জিম্মি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’ বিপরীতে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পালটা জবাবে বলেন, এই ফ্যাসিস্ট সরকার দমন-পীড়ন চালিয়ে নিজেদের ক্ষমতা রক্ষা করতে পারবে না।
অন্যদিকে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো ধরনের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সাধারণ শিক্ষার্থীরা সমর্থন করে না। এরই মধ্যে ১৯ জুলাই দিবাগত রাত আড়াইটায় খিলগাঁও থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই ২০ জুলাই গভীর রাতে মিন্টো রোডের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে তিন সমন্বয়কের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে তাদের জরুরি ৮ দফা দাবি পেশ করেন এবং জানান, এই দাবিগুলো পূরণ হলেই কেবল মূল কোটা সংস্কারের এক দফা দাবি নিয়ে আলোচনা এগোবে। বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে জানান যে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক ও সমাধানযোগ্য। তবে এই আশ্বাসের বাণী আসার আগেই ততক্ষণে দেশের বহু মায়ের বুক খালি হয়ে গেছে।
হেলিকপ্টারের গর্জন ও নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা স্তব্ধ ঢাকা
শনিবার সারাদিন রাজধানীর আকাশে চক্কর দেওয়া র্যাবের হেলিকপ্টারের বিকট শব্দ ঢাকাবাসীর মনে এক গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করে। আকাশপথের নজরদারির পাশাপাশি ভূমিতে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বিত টহল জোরদার করা হয়। শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে বসানো হয় কড়া নিরাপত্তা চৌকি বা চেকপোস্ট। বঙ্গভবন, গণভবন, বাংলাদেশ বেতার ভবন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ দেশের সব কারাগার ও ভিআইপিদের বাসভবনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়।
সাভারের রেডিও কলোনি ও প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে ভাঙচুরের পর সেখানেও সেনা মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পুরো দেশ যেন এক অদৃশ্য ও শীতল যুদ্ধের ময়দানে রূপ নেয়, যেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনার চেয়ে দমন-পীড়ন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই ছিল মুখ্য। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়; এটি একটি প্রজন্মের অধিকার আদায়ের লড়াই, কারফিউর শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ এবং তাজা প্রাণের আত্মত্যাগের এক অবিনশ্বর ঐতিহাসিক দলিল।