Wednesday 22 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / মধ্যরাতে ‘চিরুনি অভিযান’, প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’র ডাক

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২২ জুলাই ২০২৬ ০৮:২৩ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ ০৯:২০

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: ঢাকার আকাশে তখনো বারুদের পোড়া গন্ধ আর কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া। নৈঃশব্দ চিরে ঘনঘন ডেকে উঠছিল সশস্ত্র সামরিক হেলিকপ্টারের ভয়াল তোপ। ২১ জুলাইয়ের অন্ধকার গড়িয়ে ২২ জুলাইয়ের মধ্যরাতে প্রবেশ করতেই রাজধানীজুড়ে শুরু হয় ত্রাসের রাজত্ব। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক তল্লাশি ছিল না, ছিল শাসকগোষ্ঠীর এক চরম মনস্তাত্ত্বিক দমনপীড়ন। ঢাকার শান্তিনগর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী থেকে ধানমণ্ডি, প্রতিটি গলিতে সাঁজোয়া যানের গর্জন আর বাসাবাড়ির দরজায় দরজায় হিংস্র ধাক্কায় কেঁপে উঠেছিল সাধারণ মানুষের বুক। মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যরাতের অভিযানে রাজধানীর ঘরগুলো থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ৫১৬ জন নিষ্পাপ কিশোর ও তরুণকে। মাত্র ছয় দিনে সারাদেশে এই গ্রেফতারের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়, যাদের বেশির ভাগই জানত না তাদের অপরাধ কী কিংবা কোন আইনের তোয়াক্কা না করে তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর রাজপথে রক্তের বন্যা ও রাষ্ট্রীয় শক্তির গর্জন

দেশের সীমানা পেরিয়ে এই রাষ্ট্রীয় দমনের ভয়াল রূপ ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র প্রান্তরে। চট্টগ্রামে ৪৬, গাজীপুরে ১৫৬, ঠাকুরগাঁওয়ে ২৫, কুমিল্লায় ৯১ এবং ফেনীতে ৮ জনকে গুমছায়ায় বন্দি করা হয়, এমনকি গাইবান্ধায় দুটি নাশকতা মামলার ফাঁদে গ্রেফতার করা হয় ৪৫ জন প্রতিবাদী তরুণকে। একই সময়ে ক্ষমতার মসনদে বসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চাকরির ২০তম থেকে ৯ম গ্রেডে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে করার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোটা-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপে সই করে পরিস্থিতি ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা চালান।

তবে একইদিন বিকেলে ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে সভা ডেকে রাজপথের আন্দোলনকারীদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে ‘আরও শক্ত অ্যাকশন’র প্রকাশ্য হুঙ্কার দেন তিনি। তৎকালীন এই চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম আন্দোলনকারীদের সুরক্ষায় চার দফা দাবি সামনে এনে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ স্থগিতের ঘোষণা দিলেও হত্যাযজ্ঞ থামেনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ যেন আন্দোলনের এক রক্তঝরা দলিল হয়ে ওঠে, যেখানে ২২ জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৬৮ জন তাজা প্রাণের রক্তভেজা মৃতদেহ পরিজনদের কান্নার সাগরে সঁপে দিতে বাধ্য হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

কারফিউয়ের অবরুদ্ধ খাঁচা ও দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট

১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া অঘোষিত সেনাশাসনের কারফিউয়ের তৃতীয় দিন ছিল ২২ জুলাই, যা পুরো দেশকে একটি বিশালাকার বন্দিশালায় রূপ দিয়েছিল। কেবল দুপুর দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সামান্য তিন ঘণ্টার শিথিলতায় একটু শ্বাস নিতে, জরুরি খাবার কিনতে কিংবা নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে রাস্তায় নেমেছিল আতঙ্কিত নগরবাসী। কিন্তু সেখানেও টহলরত সেনাসদস্য, র‌্যাবের হেলিকপ্টার ও ভারী সাঁজোয়া যানের উপস্থিতি সাধারণ মানুষকে সর্বক্ষণ মৃত্যুর ভয়ে তটস্থ রাখে। পরিস্থিতি সামলাতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল যখন কারফিউ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন, তখন তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন হুমকি দিয়ে বলেন, ‘পাই পাই করে হিসাব দিতে হবে’। এই বিভীষিকার মধ্যে পুরো দেশকে টানা পঞ্চম দিনের মতো ডিজিটাল অন্ধকারে রেখে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে আন্দোলনের সব তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার সর্বাত্মক প্রক্রিয়া চালায় সরকার।

ডিবি কার্যালয়ে সমন্বয়কদের ওপর কালো নজরদারি

রাজপথের প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোকে স্তব্ধ করে দিতে ২২ জুলাই রাতে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহসহ কয়েকজন শীর্ষ সমন্বয়ককে হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্থান থেকে তুলে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে ও নজরদারিতে নেয় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি)। শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানো ও আন্দোলনের গতি থমকে দেওয়ার এক নীল নকশা বাস্তবায়নে নেমেছিল তৎকালীন গোয়েন্দা শাখা। তবে এই চরম ব্ল্যাকআউট, নির্যাতন আর ‘ব্ল্যাকআউট গুম’-এর ভয়াবহ পরিবেশের মধ্যেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫৬ জন সমন্বয়ক সাহসিকতার সঙ্গে যৌথ বিবৃতি দেন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আন্দোলনকারীদের হত্যা ও নির্যাতন চালিয়ে কেবল আদালতের কোনো রায় দেখিয়ে সরকার এই চরম অপরাধ আর তিন শতাধিক ছাত্র-জনতা হত্যার দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

বিশ্বজুড়ে প্রবাসীদের ঐতিহাসিক রেমিট্যান্স শাটডাউনের ডাক

একদিকে দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে মূল ধারার যোগাযোগ অচল করে দেওয়া হয়েছিল, অন্যদিকে প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিরা আগের কয়েকদিনের বর্বর হত্যাকাণ্ডের ছবি ও খবরের সত্যতা পেয়ে চরম ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিরা একযোগে ডাক দেন এক ঐতিহাসিক প্রতিবাদের, যার নাম ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে টাকা পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার এই অভূতপূর্ব ডাক তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের অর্থনীতির ওপর এক সরাসরি ও মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক আঘাত হানে। প্রবাসীদের এই সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারকে চরম অর্থনৈতিক চাপে ফেলে দেয়, যা পরবর্তী দিনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর