ঢাকা: নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই বহিষ্কারের পর পরই সব মহলে প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক দল কর্তৃক স্থায়ী বহিষ্কারের পর সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের পদ কি বহাল থাকবে? নাকি আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হবে? এবং ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগে তার বিচার হবে কি না?
সংবিধান যা বলছে
সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন; তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে…’। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানে ‘স্বেচ্ছায় পদত্যাগ’ এবং ‘দল থেকে বহিষ্কার’- এ দু’টি বিষয়কে এক করা হয়নি।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তফা শাকের উল্লাহ বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক, নৈতিক সমালোচনা বা দলীয় বহিষ্কারের কারণে সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হয়ে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অযোগ্য হলে বা তিনি নিজে পদত্যাগ করলে ভিন্ন কথা। আসন শূন্যের প্রশ্ন উঠলে সংবিধানের ৬৭(২) ধারা অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনের মতামত নেবেন।’
এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন সরকার দলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, ‘আদালত যদি তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে, তাহলে ইসি ব্যবস্থা নেবে। তবে, তিনি নিজে থেকে দল ত্যাগ করলে আসন শূন্য ঘোষণা হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে উপ-নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে।’
ইসির বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া
বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ জানান, গাজী নজরুলের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ থেকে লিখিত কোনো চিঠি পেলে আমরা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ প্রাসঙ্গিক আইন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। কোনো অনুমাননির্ভর তথ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর পর্যালোচনা শেষে আসন শূন্য ঘোষণা ও উপ-নির্বাচনের বিষয়ে কিছু জানানো যাবে।’
তিনি জানান, লিখিত নথি ও সুনির্দিষ্ট আইন কোট করেই ইসি তার দাফতরিক অবস্থান স্পষ্ট করবে। নথিপত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে পর্যালোচনা শেষে আইন অনুযায়ী আসন শূন্য ঘোষণা এবং পরবর্তী উপ-নির্বাচন সংক্রান্ত দিনক্ষণ নির্ধারণের বিষয়টি নির্ধারণ হবে। ইসি উল্লেখ করেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কার্যপ্রণালি ও উপ-নির্বাচনের ঘোষণার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। অফিশিয়াল কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন আইন, বিধিমালা ও সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
যা বলছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা
দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার জানা মতে, এই পদ শূন্য হয়ে যাবে। এখন এসব বিষয়ে এখতিয়ার সংসদের হওয়ার কথা। নির্বাচন কমিশন গেজেট নোটিফিকেশন করবে। কিন্তু শূন্য ঘোষণা সংসদ সচিবালয় থেকে স্পিকারের অফিস করবে।’
দল থেকে বহিষ্কার হলে সংসদ পদ না থাকার যৌক্তিকতা তুলে ধরে এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘দল যদি মনোনীত প্রার্থীকে বহিষ্কার করে তাহলে সে দলের মধ্যে কোথাও নেই, দলের কেউ নন এখন। দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন (জামায়াতের গাজী নজরুল ইসলাম), এক্ষেত্রে উনি যেহেতু দলের প্রতীকে নির্বাচন করেছেন, বহিষ্কারের পর তিনি দলের কেউ নন, তাহলে তিনি অযোগ্য হয়ে গেলেন। তখন পদটা শূন্য হবে।’
এই বিশেষজ্ঞের মতে, ‘সংসদ সদস্যের আসন (সাতক্ষীরা-৪ আসন) শূন্য কে করবে? এ নিয়ে আলোচনা হলে তা স্পিকার ডিক্লেয়ার করবেন। স্পিকার অফিস থেকে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য করা হয়। এর পর নির্বাচন দেওয়ার জন্য (উপ-নির্বাচন) আসন শূন্যের গেজেট করে এবং নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে।’ আইন অনুযায়ী, আসন শূন্যের গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অতীতের নজির
অতীতেও একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন নজির দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কারের পর নানা প্রক্রিয়া শেষে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হয়েছিল। অপরদিকে নবম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এইচ এম গোলাম রেজাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও স্পিকারের কাছে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় তিনি মেয়াদের শেষ পর্যন্ত এমপি পদে বহাল ছিলেন।
ঘটনা ও জামায়াতের সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুলের আপত্তিকর অবস্থার একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওগুলো সোমবার (২০ জুলাই) বিকেল থেকে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু থেকে তার সমর্থকেরা দাবি করছিলেন, এগুলো এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া ভিডিও। তবে পরবর্তী সময়ে একাধিক ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করে যে ভিডিওগুলো এআই দিয়ে বানানো নয়।
এই বিতর্কের মুখে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওর তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই সম্প্রতি তিনি তাকে বিয়ে করেছেন। তবে ওই বিয়ের কাবিননামার সত্যতা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ সংশ্লিষ্ট কাজী একটি দৈনিক পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন যে, বিয়ের স্থান সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না এবং তিনি পুরনো তারিখ বসিয়ে পরবর্তী সময়ে কাবিননামাটি তৈরি করে দিয়েছিলেন।
এমন পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক তদন্তের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এখন দলীয় সিদ্ধান্ত ইসিকে জানানোর পাশাপাশি স্পিকারের কাছেও অবহিত করতে হবে। জামায়াতের লিখিত বক্তব্য, সংসদ সদস্যের বক্তব্য ও ইসির শুনানি করে ব্যবস্থা নেওয়ার পথে এগোতে হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পরবর্তী পদক্ষেপ
এখন নির্বাচন কমিশন এবং স্পিকারের দফতরে জামায়াতে ইসলামীর আনুষ্ঠানিক চিঠি পৌঁছানোর পরই জানা যাবে, কী ঘটতে যাচ্ছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের বহিষ্কৃত গাজী নজরুলের ভাগ্যে।