Saturday 25 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / মর্গ থেকে যখন হস্তান্তর হচ্ছিল লাশ, মেট্রোরেলের জন্য তখন হাসিনার মেকি কান্না

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৫ জুলাই ২০২৬ ০৮:০৬

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: ২৪ জুলাইয়ের রক্তঝরা রাত পেরিয়ে পরদিন ২৫ জুলাই সকালে মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের ধ্বংসস্তূপের সামনে এসে হাজির হলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চারদিকে যখন শত শত ছাত্র-জনতার রক্তে রাজপথ লাল, ঠিক তখনই ভেঙে পড়া স্টেশনের কাচ আর পোড়া লোহা দেখে ক্যামেরার সামনে কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমি জনগণের কাছে বিচার চাইছি। কোটা আন্দোলনের নামে এ তাণ্ডব যারা করেছে, তাদের বিচার দেশবাসীকে করতে হবে।’ ঠিক একই সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের হিমশীতল ঘরে পরম মমতায় ৮৫টি তাজা ও রক্তাক্ত তরুণ মরদেহ একে একে গুনে স্বজনদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন চিকিৎসকেরা। একদিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামোর জন্য শাসকের সাজানো মেকি অশ্রু, অন্যদিকে ৮৫টি পরিবারে জীবনের আলো নিভে যাওয়ার নীরব হাহাকার। ২০২৪ সালের ২৫ জুলাইয়ের এই ঘটনা পুরো দেশকে এক গভীর ক্ষোভ ও ধিক্কারে আচ্ছন্ন করেছিল।

বিজ্ঞাপন

কারফিউর ফাঁদে বন্দি শহরে সেনাবাহিনীর টহল

বৃহস্পতিবারের সেই সকালটিতে ছদ্মবেশী এক স্বস্তি নিয়ে হাজির হয়েছিল সেনাটহল। টানা ছয় দিন পুরো দেশকে স্তব্ধ করে রাখার পর সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কিছুটা সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। ব্যাংক ও অফিস বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত চালু রাখার নির্দেশ আসে। তবে এই সামান্য ছাড় সাধারণ মানুষের বুকের ভেতর চেপে বসা ভয় ও ক্ষোভকে তিলমাত্র কমাতে পারেনি। ঢাকার অলিগলিতে সেনাবাহিনীর ভারী বুটের শব্দ, পুলিশের তল্লাশিচৌকি আর প্রতিনিয়ত পথচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ এক চরম ভীতিকর পরিবেশ বজায় রেখেছিল। রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে কারফিউ শিথিলের ঘোষণা থাকলেও মানুষের চোখে-মুখে ছিল এক অদেখা আতঙ্ক। মুখে মাস্ক না থাকলেও প্রতিটি মানুষ আতঙ্কে মুখ ঢেকেই রাস্তায় নেমেছিল। আন্দোলনকারীদের মতে, শহর খুলে দেওয়ার এই তামাশা ছিল মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ দেখানোর এক কুৎসিত প্রচেষ্টা।

হাজারো গ্রেফতারের জালে রুদ্ধ কণ্ঠের লড়াই

২৫ জুলাইয়ের দিনটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চিরুনি অভিযান এমন এক ভয়াবহ রূপ নেয়, যা পুরো দেশকে এক অতল আতঙ্কের রাজ্যে পরিণত করে। কেবল ওই একদিনেই দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়, যার মধ্যে কেবল ঢাকাতেই ৬৪১ জন পুলিশের জালে আটকা পড়েন। পাঁচ দিনের তাণ্ডবে র‍্যাব সারা দেশ থেকে ২২৮ জনকে আটকের নামে তুলে নিয়ে যায়। গণগ্রেফতারের এই নিষ্ঠুর কৌশল চালিয়ে ছাত্র-জনতার কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চেয়েছিল স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, কোনো প্রজ্ঞাপন বা গণগ্রেফতার দিয়ে এই রাষ্ট্রীয় গণহত্যার দায় এড়ানো যাবে না। আন্দোলন তখন রাজপথের ছাত্র-জমায়েত ছাড়িয়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে স্বৈরাচার পতনের এক দাহ্য সোপানে পরিণত হয়েছিল।

বিশ্বমঞ্চে তোলপাড় ও কূটনৈতিক দর কষাকষি

ঢাকার রাজপথ থেকে উঠে আসা রক্তের দাগ মুহূর্তেই আছড়ে পড়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করলে চরম অস্বস্তিতে পড়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রবাসীদের দমাতে বিদেশে অবস্থিত সব মিশন ও দূতাবাসে চিঠি পাঠিয়ে বিক্ষোভকারীদের তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দেয় স্বৈরাচারী প্রশাসন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ততক্ষণে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ঢাকায় থাকা তাদের ‘জরুরি নয়’ এমন কর্মকর্তা ও পরিবারকে দ্রুত বাংলাদেশ ত্যাগের অনুমতি দেয়। জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্পষ্ট ভাষায় সরকারের এই রক্তক্ষয়ী দমনপীড়নের তীব্র নিন্দা জানায়। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক সব সহিংসতার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। বিশ্বমঞ্চে স্বৈরাচারের মুখোশ এক লহমায় খুলে পড়েছিল।

স্থবির শিক্ষাব্যবস্থা

ছাত্রদের ওপর নেমে আসা এই পশুপাখির মতো তোপের সরাসরি প্রভাব পড়ে গোটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা লুকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৮, ২৯, ৩১ জুলাই এবং ১ আগস্টের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। লাখ লাখ পরীক্ষার্থী ও তরুণের শিক্ষাজীবন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। তবে ছাত্রসমাজ তা পরোয়া করেনি; তারা জানিয়ে দেয়, ভাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো পরীক্ষা হতে পারে না। ২৫ জুলাই নিহতদের স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বালন, কবর জিয়ারত এবং গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি দেওয়া হয়। চারদিকের থমথমে পরিস্থিতির মাঝে এই একটি বার্তাই রটে গিয়েছিল, স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ছাড়া এই ছাত্র-জনতা আর ঘরে ফিরবে না।

অশ্রু আর রক্তের হিসাব কি মিলবে কোনোদিন?

২৫ জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। যে শাসক নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হাজারো তরুণের বুকে গুলি চালাতে দ্বিধা করেনি, তার মুখে মেকি অশ্রু দেখে সেদিন পুরো জাতি ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষী, বুলেট, গুম কিংবা সাজানো কান্না দিয়ে জনগণের ন্যায়সংগত ক্রোধকে কখনো দমানো যায় না।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর