Wednesday 29 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / জনতার লাল প্রতিরোধ, জামায়াত নিষিদ্ধে শেখ হাসিনার বৈঠক

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৯ জুলাই ২০২৬ ০৮:১১ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ ০৯:০১

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: ২০২৪ সালের ২৯ জুলাইয়ের সূর্যটা যখন উঠেছিল, বাংলাদেশের রাজপথ আর সাইবার দুনিয়া তখন আর দশটা সাধারণ দিনের মতো ছিল না। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, স্বজন হারানোর বেদনা আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে সেদিন স্তব্ধ হয়ে যায়নি আন্দোলন, বরং তা রূপ নিয়েছিল নিঃশব্দ অথচ প্রবল এক আগ্নেয়গিরিতে। কোনো রাজপথ কাঁপানো চিৎকার ছাড়াই, কোনো স্লোগানের আওয়াজ ছাড়াই চারপাশ হঠাৎ লাল রঙে রঞ্জিত হতে শুরু করেছিল।

চোখের কোণে ও মুখে শক্ত করে বাঁধা লাল কাপড়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালে দেয়ালে ছড়িয়ে পড়া লালের আভা, সব মিলিয়ে সেদিন নীরবতাই হয়ে উঠেছিল এই ভূখণ্ডের সবচেয়ে জোরালো প্রকাণ্ড উচ্চারণ। রাষ্ট্র যখন একতরফা শোক চাপিয়ে দিয়ে হত্যা ও নির্যাতনের দায় ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই বাংলার তরুণ সমাজ আর সর্বস্তরের মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছিল, রক্তে লেখা ইতিহাস কখনো রাষ্ট্রীয় নাটকে মুছে ফেলা যায় না।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রীয় শোকের বিপরীতে জনতার লাল প্রতিরোধ

রাষ্ট্রের সাজানো শোকের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শুরুটা হয়েছিল গভীর মধ্যরাতে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার ওপর মলম লাগানোর ছলে তৎকালীন সরকার শেখ হাসিনা যখন ৩০ জুলাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, তখন ছাত্র-জনতা তা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার মধ্যরাতেই বার্তা দিয়ে জানিয়ে দেন, হাজারো সহপাঠীর রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার পর এমন শোক আসলে এক চরম উপহাস।

সেই উপহাসের জবাবে রক্তে রাঙা লাল কাপড় মুখে বেঁধে নীরব প্রতিবাদের যে ডাক দেওয়া হয়েছিল, দেখতে দেখতে তা রূপ নেয় এক অপ্রতিরোধ্য জাতীয় প্রতিরোধে। ভার্চুয়াল জগতের সীমানা ছাড়িয়ে ঢাকার পল্টন, মিরপুর, সায়েন্সল্যাব থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ পর্যন্ত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই লালের শিখা।

ডিবির সাজানো নাটক ও রাজপথের চরম ধিক্কার

এদিকে ক্ষমতার দাপটে অন্ধ প্রশাসন ভেবেছিল ডিবি কার্যালয়ে আন্দোলনকারী প্রধান সমন্বয়কদের আটকে রেখে সাজানো খাবারের ছবি তুলে পুরো আন্দোলনকে স্থবির করে দেওয়া যাবে। তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদের আতিথেয়তার সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর রাজপথে তার উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদার আমরণ অনশন শুরু করে সাজানো নাটকের মুখোশ উন্মোচন করে দেন।

ইন্টারনেটজুড়ে ‘ডিবির ভাতে বিষ আছে’ কিংবা ‘ভাত খাইয়ে আন্দোলন থামানো যাবে না’, এমন তীব্র কটাক্ষে ছেয়ে যায় ফেসবুকের পাতা। এমনকি উচ্চ আদালতও পুলিশের এই অপেশাদার আচরণের তীব্র সমালোচনা করে মন্তব্য করেন, ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে আপ্যায়ন করানোর ছবি প্রকাশ করা জাতির সাথে এক ধরনের ক্রূর রসিকতা। আদালতের এই অবস্থান আন্দোলনকারীদের নৈতিক সাহস আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধে বৈঠক

রাতেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে বসেন কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে। বৈঠকে উঠে আসে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবি, যা ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কৌশলের একটি অংশ। বৈঠকে শেষে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘১৪ দলের নেতারা মনে করেন, বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রদল ও শিবির তাদের দোসর জঙ্গি গোষ্ঠীকে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাই ১৪ দলের নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে জামায়াত ও শিবিরকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধে একমত হয়েছেন।’

বিএনপির তৎপরতা

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সরকার কর্তৃক প্রকাশিত চলমান কোটা আন্দোলনে নিহতদের নাম ও সংখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে নিহতের এ সংখ্যা অনেক বেশি।’

শিক্ষকদের রাজপথে নামা ও জনগণের তদন্ত কমিশন

রাজপথে একদিকে পুলিশের মারমুখী ভূমিকা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় শিক্ষক সমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমা’’-এর ব্যানারে শতাধিক শিক্ষক রাজপথে নেমে এসে ছাত্রদের ওপর গণগ্রেফতার ও লাঠিচার্জ বন্ধের দাবি জানান। একই দিনে তৎকালীন সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের উদ্যোগে ‘জাতীয় গণতদন্ত কমিশন’ গঠনের ঘোষণা আসে, যা রাষ্ট্রের তথাকথিত তদন্তের বিপরীতে জনগণের সত্য উদঘাটনের এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে দাঁড়ায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল আর হেলিকপ্টার টহলের ভেতরেও অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী গ্রেফতার বরণ করেও রাজপথ ছাড়েনি। রাজপথের এই উত্তাল তরঙ্গের সামনে রাষ্ট্রযন্ত্র তখন এতটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল যে, জনদৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে এবং রাজপথের অদম্য ক্ষোভকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে শেখ হাসিনার সরকার তড়িঘড়ি করে ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠক ডেকে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার রাজনৈতিক চাল চালে। কিন্তু দিনশেষে কোনো চালই রক্তে ভেজা আন্দোলনের মোড় ঘোরাতে পারেনি।

শেষ বিকেলের নীরবতা থেকে স্বৈরাচার পতনের সূচনা

২৯ জুলাইয়ের সেই লাল কাপড় শুধুই একটি কাপড়ের টুকরো ছিল না, তা ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ের সূচনা আর শাসকের পতনের শেষ বার্তা। যে বিপ্লব শুরু হয়েছিল রক্ত আর লালে, তা মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল ষোল বছরের জগদ্দল পাথরকে। ইতিহাসের পাতায় ২৯ জুলাই তাই কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার, প্রতিবাদকে শিল্পে রূপ দেওয়ার এবং ফ্যাসিবাদের চোখে চোখ রেখে রাজপথ আঁকড়ে ধরে রাখার এক অবিস্মরণীয় দিনলিপি।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর