ঢাকা: ঢাকার আকাশ সেদিন কেবল মেঘলা ছিল না, থমথমে বাতাসে বারুদের তীব্র গন্ধ ভাসছিল। রাজপথে তখন বুলেটের গর্জন, মানুষের আর্তনাদ আর লাখো কণ্ঠের এক অদম্য গর্জন ‘এই রাষ্ট্র আর চলবে না আগের নিয়মে’। চারদিকে এক অদ্ভূত অনিশ্চয়তা, টানটান উত্তেজনা আর বাঁচার লড়াই। বলছি ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের কথা। ক্যালেন্ডারের পাতায় যা চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে গেছে ‘ঐতিহাসিক ৩৬ জুলাই’ নামে।
কোনো পূর্বনির্ধারিত ছক নয়, নয় কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশিকা; রাজপথে আছড়ে পড়েছিল লাখ লাখ রক্তাক্ত, বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের উত্তাল জনসমুদ্র। দিনটি ছিল একটি শাসনব্যবস্থার পতন নয় কেবল, একটি পুরো যুগের অবসান। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ক্ষণ খুব কমই এসেছে, যেখানে স্বৈরতন্ত্রের শিকল ভেঙে চুরমার করে দিয়ে সাধারণ জনগণ রাষ্ট্র কাঠামোর মালিকানা আবার নিজেদের হাতে ছিনিয়ে নিয়েছে।
বারুদের গন্ধ আর রক্তাক্ত জুলাইয়ের দাবানল
এই আন্দোলনের সলতে পেকেছিল জুন মাসের শেষভাগে, সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি নিয়ে। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই আন্দোলন তার রূপ পরিবর্তন করে রূপ নেয় এক অভূতপূর্ব গণজাগরণে। বিশেষ করে ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যমী তরুণ আবু সাঈদের বুকের ভেতর পুলিশের নির্বিচার গুলি আছড়ে পড়ার ঘটনা সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটায়।
সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি শান্ত দেশকে এক মুহূর্তে উত্তাল মহাসমুদ্রে পরিণত করে। এরপর জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহজুড়ে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে শুধুই সংঘর্ষ আর তাজা রক্তের ছাপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডা ও মুক্তচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু টিএসসিতে মোমবাতির আলো আর গোপনীয়তার আঁধারে রচিত হয় অভ্যুত্থানের গোপন রূপরেখা। এটি আর কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রইল না; রিকশাচালক, শ্রমিক, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক ও গৃহিণীরা একে একে রাজপথে নেমে এলেন।
শহিদের অমোঘ চিঠি আর রাজপথের ঐতিহাসিক স্মারক
এই বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের অন্তরালে থেকে গেছে বুকফাটা কান্না ও অগণিত আত্মত্যাগের গল্প। গেন্ডারিয়ার ১৬ বছরের কিশোর আনাস, যে মা-বাবার নিষেধ অমান্য করে পড়ার টেবিলে হৃদয়বিদারক এক চিঠি রেখে চানখাঁরপুলের মিছিলে যোগ দিয়েছিল। চিঠিতে লিখেছিল ‘একদিন তো মরতেই হবে, তাই ঘরের ভেতর স্বার্থপরের মতো বসে না থেকে সংগ্রামের মাঠে বীরের মতো মৃত্যু অনেক শ্রেষ্ঠ।’ আনাসের সেই তাজা রক্ত আর শাহাদাত বরণ কেবল ট্রাইব্যুনালের নথি নয়, নতুন প্রজন্মের প্রেরণা হয়ে ওঠে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আসিফ হাসানের আত্মত্যাগ কিংবা বিজয়ের ঠিক মুহূর্তে যাত্রাবাড়ীতে দুই চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়ে ফেলা নাফিজের মতো হাজারো আহত তরুণের ত্যাগ এই অর্জনকে অর্থবহ করেছে।
বুলেটের বাঁধ ভেঙে ঢাকার পথে জনতার জোয়ার
৪ আগস্টের রাত থেকেই পুরো ঢাকার চারপাশে যেন এক বিশাল অবরুদ্ধ নগরীর দৃশ্যপট তৈরি হয়। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে ফতুল্লা, আশুলিয়া, গাজীপুর আর কেরানীগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে লাখ লাখ মানুষ পায়ে হেঁটে, ট্রাকে চেপে, সাইকেলে চড়ে রাজধানীর দিকে এগোতে থাকে। ফতুল্লার সেতু কিংবা মাওয়া ফেরিঘাটে নৌকার সারি থামিয়ে দেওয়ার সব আয়োজন ধসে পড়ে মানুষের অদম্য সাহসের সামনে। সাভার ও গাজীপুর চৌরাস্তায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণে একের পর এক তরুণ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও জনতার ঢলকে পিছু হটানো যায়নি। গাজীপুরে সোহান কিংবা আমিনবাজারে ছাত্র-জনতার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলেও সেই তাজা রক্ত মানুষের প্রতিবাদের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ঢাকার প্রবেশপথগুলো হয়ে ওঠে এক মুক্তাঞ্চল, যেখানে পুলিশের বাধা চুরমার করে দিয়ে মানুষ কেবল একটাই স্লোগান দিচ্ছিল ‘গণভবন নয়, এখন এটি জনগণের ভবন’।
৪৫ মিনিটের শেষ হুঁশিয়ারি এবং শেখ হাসিনার প্রস্থান
৫ আগস্টের সকালটা ছিল নিস্তব্ধ, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঝড়ের সংকেত। চারদিক থেকে জনস্রোত যখন শাহবাগ, পল্টন, সংসদ ভবন আর গণভবনের দিকে ধেয়ে আসছিল, তখন ক্ষমতার ক্ষমতার অলিন্দে চলছিল চরম সিদ্ধান্তহীনতা ও আতঙ্ক। পরিস্থিতির ভয়াবহতা টের পেয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন শেষবারের মতো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে। কিন্তু রাজপথের বাস্তবতা তখন কোনো ভাষণ শোনার অবস্থায় ছিল না। শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব থেকে তাকে জানানো হয় যে, রাজপথের এই উত্তাল মানবপ্রবাহকে ঠেকানো আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ঘড়ির কাঁটা যখন দ্রুত ঘুরছিল, ঠিক তখনই তাকে দেওয়া হয় সময় বেঁধে দেওয়া চূড়ান্ত নির্দেশ ‘মাত্র ৪৫ মিনিট’। অবশেষে ক্ষমতার প্রায় ১৬ বছর পর দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে নিরুপায় শেখ হাসিনাকে পাড়ি জমাতে হয় প্রতিবেশী দেশের উদ্দেশে।
গণভবন ও সংসদভবনে জনগণের প্রবেশ
তৎকালীন সরকার শেখ হাসিনার প্রস্থানের পর গণভবনে ঢুকে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। তার আগে গণভবন ছেড়ে চলে যায় নিরাপত্তাবাহিনী। সাধারণ জনগণের গরু, মাছ, হাঁস, মুরগি, আসবাবপত্র, ফ্রিজ, এসিসহ নানা পণ্য নিয়ে যাওয়ার ছবি ভাইরাল হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। অপরদিকে সংসদ ভবনও জনগণের দখলে চলে যায়। জনতার স্রোত আটকাটে পারেনি নিরাপত্তাবাহিনীও । তৎকালীন স্বৈরাচারের সংসদকে ঘৃণা করে সংসদ ভবনের ভেতরেও আগুন দিয়ে দেয় জনগণ।
রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সেনাপ্রধান
দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সেনানিবাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বৈঠক শেষে সরাসরি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দেশ পরিচালনায় খুব দ্রুতই একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হচ্ছে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ শীর্ষ দলগুলোর পাশাপাশি শিক্ষক আসিফ নজরুল ও জোনায়েদ সাকিও এই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন। তবে ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না হওয়ায়, তাদের আস্থাভাজন শিক্ষক আসিফ নজরুলের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশবাসীকে চরম ধৈর্য ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার আকুল আহ্বান জানিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘মারামারি, সংঘাত আর অরাজকতা করে আমরা কিছুই পাব না। সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখুন, সব অনাচারের বিচার করা হবে। রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।’
ছাত্রদের শান্ত হতে আসিফ নজরুলের ভিডিও-বার্তা
৫ আগস্ট বিকেল সোয়া ৩টায় নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া ৩৮ সেকেন্ডের এক ভিডিও-বার্তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা এখন আর্মি চিফের (সেনাবাহিনীর প্রধান) সঙ্গে একটা আলোচনায় আছি। আমি যতটুকু ওনার (সেনাপ্রধান) সঙ্গে কথা বলেছি, আমার কাছে মনে হয়েছে আমাদের ছাত্র-জনতার যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা, তা উনি বুঝতে পেরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করছি আপনাদের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ আসছে। ছাত্র-জনতা ও তরুণ সমাজের প্রতি আমার আকুল অনুরোধ , আপনারা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখেন, ধৈর্য ধরেন। এ দেশটা আমাদের। এখন থেকে আমরা অত্যন্ত সঠিক পথে অগ্রসর হবো।’
শান্ত থাকার আহ্বান মির্জা ফখরুলের
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে চরম সংযম ও শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক শেষে এক বার্তায় তিনি জানান, আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে এবং সেনাপ্রধানের নির্দেশনায় তিনি দেশবাসীকে শান্ত থাকার অনুরোধ করছেন।
বিমানবন্দরে ৬ ঘণ্টার স্থগিতাদেশ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৫ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সবধরনের ফ্লাইট চলাচল টানা ৬ ঘণ্টার জন্য বন্ধ ঘোষণা করে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর)।
সব প্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা
একই রাতে আইএসপিআর বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, দেশজুড়ে স্থবিরতা কাটিয়ে স্বাভাবিকতা ফেরাতে মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) সকাল থেকেই সব সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, কলকারখানা এবং স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে খোলা থাকবে।
২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম ও অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা
গ্রেফতার সববন্দির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তির দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্ট জানান, আন্দোলনকারী ছাত্র-নাগরিক ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তর্বর্তী জাতীয় সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে। সেনাসমর্থিত বা রাষ্ট্রপতি-শাসিত কোনো সরকারকে বিপ্লবী ছাত্র-জনতা মেনে নেবে না উল্লেখ করে তিনি আন্দোলনকারীদের শহিদদের ‘জাতীয় বীর’ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার স্বার্থে ছাত্র-জনতাকে রাজপথে থাকার নির্দেশ দেন।
বঙ্গভবনে সর্বদলীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্বে বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধান, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অনতিবিলম্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ এবং সংঘাত-লুটতরাজ বন্ধে কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ আন্দোলনে আটক সব বন্দির অবিলম্বে মুক্তির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও সংসদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত
৫ আগস্ট রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুততম সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে এবং সেই সরকার অতি দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সংসদ বিলুপ্ত করা, খালেদা জিয়া ও আন্দোলনকারী বন্দিদের মুক্তি প্রদান এবং নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের সুচিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
ভারতে শেখ হাসিনা ও নিরাপত্তা কমিটির সঙ্গে মোদির বৈঠক
শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদ ঘাঁটিতে অবতরণের পর তিনি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় নিজের সরকারি বাসভবনে সংসদীয় নিরাপত্তা কমিটির সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
মা আর রাজনীতিতে ফিরবেন না: সজীব ওয়াজেদ জয়
বিবিসিকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় জানান, শেখ হাসিনা আর কখনোই রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করবেন না। অমানসিক পরিশ্রম করার পরও জনগণের এমন আচরণে তিনি অত্যন্ত হতাশ হয়েছেন। জয় আরও নিশ্চিত করেন, প্রাণরক্ষার্থেই শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেছেন এবং ৪ আগস্ট থেকেই তিনি পদত্যাগের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে হাসপাতালে শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাৎ
শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান দলের শীর্ষ নেতারা। তারেক রহমানের সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে জরুরি অনলাইন বৈঠক সম্পন্ন করেই মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস হাসপাতালে উদ্দেশে রওনা হন।
এক নতুন ভোরের সূচনায় উল্লাসিত বাঙালি
দুপুরের পর যখনই স্বৈরাচারী শাসকের পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর দাবানলের মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, পুরো বাংলাদেশ যেন এক অলৌকিক আনন্দের জোয়ারে ভেসে যায়। বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা ভয়, ক্ষোভ আর নির্যাতন এক মুহূর্তে উবে গিয়ে নেমে আসে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। সাধারণ মানুষ, নারী, শিশু, প্রবীণ সবাই মিলে ধেয়ে যান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে। গণভবনের লেকে নেমে মানুষের আনন্দমিছিল, বারান্দায় বসে সাধারণ মানুষের তরমুজ খাওয়া কিংবা বিজয় পতাকা উড়িয়ে সেলফি তোলার দৃশ্যগুলো বিশ্বজুড়ে এক অভাবনীয় নজির তৈরি করে। রক্তে লেখা এই ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক কোনো একক শাসক বা রাজনৈতিক দল নয়, এই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক সাধারণ জনগণ।
ইতিহাসের মোড় ঘুরানো দিন
রাজপথের ধূলো আর রক্তের দাগ শুকিয়ে যাবে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে এই রক্তঝরা জুলাই ৩৬, অর্থাৎ ৫ আগস্ট এর আন্দোলনের গল্পগুলো। সেদিন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বুলেটের মুখে বুক পেতে দিয়ে শিখিয়ে দিয়ে গেছে যে, অন্যায় ও স্বৈরাচারের প্রাচীর যত বিশালই হোক না কেন, জনগণের শক্তির কাছে তা বালির বাঁধের মতো ধসে পড়তে বাধ্য। শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন প্রভাত প্রতিদিন আমাদের মনে করিয়ে দেবে, এই স্বাধীনতা কোনো অনুদান নয়, এটি লাখো মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগে কেনা এক চিরন্তন অধিকার।