ঢাকা: পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশকে আর কোনো দেশের ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বা অনুগত রাষ্ট্র হিসেবে রাখা হবে না। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হিসেবে এই নীতি মেনে চলা হবে।
বুধবার (০৫ আগস্ট) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জুলাই গণ অভ্যুত্থান দিবস- ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি একথা বলেন।
খলিলুর রহমান বলেন, জুলাই সংগ্রামের সাফল্যের ধারা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বকীয়তা রক্ষা করা এখন বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপট এবং নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার পরিকল্পনা করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শুরুতে বক্তব্য রাখেন ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আবদুল মুহিত। এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম)।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তৃতায় গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের অসীম সাহস ও দেশপ্রেমকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বর্ণনা করেন।
বক্তব্যে ২০২৪ সালের সেই উত্তাল সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, সে সময় দেশে এক নজিরবিহীন ‘ব্ল্যাক আউট’ বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা ঘটেছিল, যা এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেখা যায়নি। এই সময়টিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ‘নৃশংসতম সময়’ এবং একটি ‘বড় কালো অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
২০২৪ সালে ওই সময়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, সেই সময় তিনি জাতিসংঘের মহাসচিবের কার্যালয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। বাংলাদেশের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিচলিত হয়ে তিনি ১ আগস্ট সরাসরি মহাসচিবের দফতরে বিষয়টি অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেন। ধারণা করা হয়, এই আন্তর্জাতিক তৎপরতার ফলেই পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে গুলিবর্ষণ বন্ধ হয় এবং দেশের পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে বক্তা জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময়ের তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল— প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন করা।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ তার হারানো গৌরব ও অবস্থান ফিরে পেতে শুরু করেছে। সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন যে, এক সময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে হারিয়ে যেতে বসা বাংলাদেশ পুনরায় শক্তিশালীভাবে বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি আরও বলেন, ১৯৭০-এর দশকেও বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক সক্ষমতার এক অভাবনীয় প্রমাণ দিয়েছিল। স্বাধীনতার মাত্র ৪-৫ বছরের মাথায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদের নির্বাচনে জাপানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রকে পরাজিত করেছিল। সেই সময়কার অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদদের সাহসিকতা ও দক্ষতার উদাহরণ দিয়ে জানানো হয় যে, বাংলাদেশ অতীতেও ‘অসম্ভব মিশন’ সফল করেছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সক্রিয়তা বাড়াতে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রার্থিতা পুনরায় চালু করার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার আন্তর্জাতিক প্রভাব পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আঞ্চলিক ও বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা বজায় রেখে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে বদ্ধপরিকর।
জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর আহ্বান জানান তিনি।
জুলাইয়ের শহীদ এবং আহতরা যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা পালনের পূর্ণ সক্ষমতা ও সদিচ্ছা সরকারের রয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে উল্লেখ করেছেন, দেশ যেন আর কখনোই কোনো ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বা অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত না হয়, সেই বিষয়ে সকলকে সজাগ থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি দেশের অকুতোভয় তরুণ প্রজন্মের প্রশংসা করে বলেন, এই দুরন্ত ছেলেমেয়েরা একটি ভয়াবহ দানবের হাত থেকে দেশকে ছিনিয়ে এনে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন এই দেশটাকে মায়া, ভালোবাসা, মেধা এবং পূর্ণ ডেডিকেশন দিয়ে আগলে রাখা ও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হলো প্রধান কাজ। প্রতিটি মুহূর্তে জুলাইয়ের শহীদদের দেওয়া এই মহান দায়িত্বের কথা স্মরণ রেখে কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান তিনি।