Thursday 03 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মক্কা চুক্তি নিয়ে ‘ইতিবাচক’ বাংলাদেশ, চলছে লাভ-ক্ষতির হিসাব

অপূর্ব কুমার সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:২৩ | আপডেট: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:২৭

মক্কা চুক্তি নিয়ে ‘ইতিবাচক’ আগ্রহ রয়েছে বাংলাদেশের। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং গাজায় অব্যাহত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জোটের প্রথম বৈঠক। এই বৈঠকে সদর দফতর রিয়াদে এবং প্রথম মহাসচিব পদে পাকিস্তানের একজন প্রতিনিধির থাকার কথা চূড়ান্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই জোটে বাংলাদেশের থাকা না থাকা নিয়ে চলছে সবর্ত্র আলোচনা । বিশ্লেষকরা হিসাব কষছেন বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির।

বিজ্ঞাপন

মক্কা চুক্তি কী?

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয় ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায়। এতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান অংশ নেয়। শুরুতে পাকিস্তান ও সৌদি আরব গতবছরে একটা নিরাপত্তা চুক্তি করেছিল। চুক্তির মূল বিষয় হলো- কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো হবে। অনেকে এই জোটকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তবে এখন এই জোটের চূড়ান্ত কৌশল এখনো নির্ধারিত হয়নি।

কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি এখনো ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়। ন্যাটোর মতো যৌথ কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী বা নির্দিষ্ট সামরিক কাঠামো এখনো নেই। সেই কারণে যতক্ষণ না এটির চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা দেয় ততক্ষণ এটিকে সামরিক জোট বলতে নারাজ বিশ্লেষকরা।

কীভাবে হলো মক্কা চুক্তি?

মক্কা চুক্তির পেছনে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রদানের সক্ষমতা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তাদের মিত্রদের মধ্যে আশঙ্কা বেড়েছে।

বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে ইয়েমেনের হুথি হামলা, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির পরিবর্তনে রিয়াদ নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হয়েছে। আর সে কারণেই এই নতুন জোট। এতে সৌদি আরবের দিক থেকে রয়েছে-অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত অবস্থান। তুরস্ক দিচ্ছে সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প ও ন্যাটো অভিজ্ঞতা। আর পাকিস্তান দিচ্ছে বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা।

এই তিন দেশের স্বার্থের মিল থেকেই একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর ধারণা তৈরি হয়েছে। সেখানে অন্য দেশ যোগ দিতে চাইলে সেই দেশকে সাধুবাদ জানান হবে বলে সদস্য দেশগুলো প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে। গত সপ্তাহে পাকিস্তান জানিয়েছে, বাংলাদেশের এই জোট যোগ দেওয়ার আগ্রহ ইতিবাচক। তুরস্কের গণমাধ্যমে এ বিষয়ে ইতিবাচক খবর প্রকাশ করছে।

যা হলো প্রথম বৈঠকে

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে জোটের সদরদফতর স্থাপনে একমত হয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। সোমবার (৩১ আগস্ট) তুরস্কে তিন দেশের প্রতিনিধিদের প্রথম বৈঠকের পর দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে যে সেক্রেটারিয়েট স্থাপন করা হবে, সেখানে প্রথম তিন বছরের জন্য মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন পাকিস্তানের একজন প্রতিনিধি।

বৈঠক শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, জোটের সদস্যরা তাদের যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় জোরদারে একসঙ্গে কাজ করবে। চলতি আগস্টের শুরুতে সই হওয়া মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। চুক্তি অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা বাকি দুই দেশের ওপরও আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।

বাংলাদেশ যে কারণে আগ্রহ দেখাচ্ছে

বাংলাদেশের আগ্রহের বেশ কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে। কারণ, সৌদি আরব ইসলামের পবিত্র ভূমি। মুসলিম উম্মার তীর্থভূমি হওয়ায় দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আবেগের। পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার অংশীদার। প্রায় ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত— যা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার কাছে রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় বা আবেগের নয়, এটি অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।

এ ছাড়াও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক নতুন নয়। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশি সামরিক সদস্যরা সৌদি আরবে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সহযোগিতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী ও সামরিক সক্ষমতা সৌদি আরবের কাছে পরিচিত। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। বাংলাদেশি সেনা ও মেডিকেল টিম সৌদি আরবে মোতায়েন ছিল।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ওআইসিভিত্তিক কূটনীতিতে সক্রিয়। মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হলে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা আলোচনায় বাংলাদেশের ভূমিকা বাড়তে পারে। যদি বাংলাদেশ ভবিষ্যতে যুক্ত হয়, তাহলে সম্ভাব্য কিছু সুবিধার মধ্যে থাকতে পারে। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে সামরিক প্রশিক্ষণ সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সমন্বয়। তবে এসব নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত ও বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ধরন কী হবে তার ওপর।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির হিসাব

মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন অংশীদার পেতে পারে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আলোচনায় ঢাকার উপস্থিতি বাড়তে পারে। বাংলাদেশ সামরিক আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতা পেতে পারে।

অন্যদিকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য কিছু ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’— এই নীতি অনুসরণ করে। কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হলে অনেক দেশ বাংলাদেশের অবস্থান নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে পারে।

প্রতিবেশী ভারতের উদ্বেগ

মক্কা চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি নজর রাখছে ভারত। কারণ পাকিস্তান এই জোটের অন্যতম সদস্য, তুরস্কের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে গতকয়েক বছরে বিভিন্ন ইস্যুতে টানাপোড়েন দেখা গেছে। ভারত আশঙ্কা করছে, পাকিস্তান এই কাঠামোকে কূটনৈতিক ও সামরিক সুবিধা বাড়াতে ব্যবহার করতে পারে। আর ঢাকা যদি এতে যুক্ত হয়, দিল্লি বিষয়টিকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ হিসেবেও দেখবে।

গত ২৮ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস জয়সোয়াল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘বাংলাদেশের মক্কা চুক্তি নিয়ে আগ্রহের ওপর নজর রাখছে ভারত।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিবেশীদের সকল কিছুর ওপর নজর রাখি। যদি সেখানে ভারতের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট হয়।’

এদিকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নতুন দেশ যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার আবেদন করলে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পরামর্শ করেই তা বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান।

যেসব প্রশ্ন বাংলাদেশের সামনে আসছে

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসেছে। এটি কি সামরিক জোট, নাকি শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতা? সদস্য হলে বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের সামরিক বাধ্যবাধকতা থাকবে? ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে? যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো বড় শক্তিগুলো বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে?

কূটনীতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ‘বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে— তাৎক্ষণিক সামরিক জোটে যোগ না দিয়ে পর্যবেক্ষক বা সহযোগী অংশীদার হিসেবে সম্পর্ক গভীর করা। কেননা বাংলাদেশের মূল স্বার্থ হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়ন। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার রক্ষা, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। তাই মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি সুযোগ, তেমনি এটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষাও।’

সেই কারণে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—নিরাপত্তা সহযোগিতা কতটা বাড়ানো যাবে, কিন্তু একইসঙ্গে ভারতসহ প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা যাবে। তবে জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে অন্য দেশের চিন্তার কারণ নেই বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ জোটে গেলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাঁচার আগে, মরার চিন্তা করে লাভ নাই।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র দাবি করেছে, আগামী ২১-২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌদ আরব সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। ওই সময় সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এই প্রস্তাবের পর বাংলাদেশও নিজের আগ্রহ তুলে ধরবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে জানতে চাইলে চীনে দায়িত্ব পালন করা সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘মক্কা চুক্তি নিয়ে আমাদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। হুট করে কোনো জোটে যাওয়া ঠিক নয়। এমন কোনো জোটে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে আমাদের হাত-পা বাঁধা পড়ে যায়। আমাদের সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো সমস্যা নেই। তবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্যা আছে। আমাদের এটা নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে।’

এ বিষয়ে চিন্তক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী সারাবাংলাবে বলেন, ‘মক্কা চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো তিন দেশের মধ্যে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণকে যৌথ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনার মাধ্যমে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থকে পারস্পরিকভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে এই চুক্তির কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এর প্রয়োগের ওপর। কোনো সদস্য দেশ সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে অন্য দুই দেশ কী ধরনের সহযোগিতা দেবে, সেই সহযোগিতার মাত্রা ও সামরিক প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো এখনো স্পষ্টভাবে পরীক্ষিত নয়।’

আব্বাসী আরও বলেন, ‘মক্কা চুক্তি আপাতত একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করছে। এর বাস্তব সক্ষমতা নির্ধারিত হবে তিন দেশের পারস্পরিক আস্থা, সামরিক সমন্বয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সংকটময় সময়ে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।’

অন্যরা বলছেন, এখনো এটি ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়। ন্যাটোর মতো যৌথ কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী বা নির্দিষ্ট সামরিক কাঠামো এখনো নেই।

সরকার যা বলছে

মক্কা চুক্তির বিষয়ে গত ২৭ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে বলেন, ‘এই চুক্তিটি তিনটি দেশের মধ্যে হয়েছে এবং আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। তবে এতে যোগদানের বিষয়টি এখনো আসেনি। কারণ, এটি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে। তারা যদি বাংলাদেশকে এই প্যাক্টে নেওয়ার অভিপ্রায় প্রকাশ করে, তবে আমরা নিশ্চয়ই সেটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব।’

তিনি বলেন, ‘যেহেতু এখনো আমন্ত্রণের বিষয়টি আসেনি, তাই এখনই এর ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনার সময় হয়নি।’ তবে বাংলাদেশ বিষয়টি বিবেচনায় রাখবে বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

মক্কা চুক্তির তাৎপর্য তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, এই প্যাক্ট যদি বিস্তৃত হয় তবে এটি হবে মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা। এটি আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং, এটি নিয়ে অন্য কারও উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই।’

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘মক্কা ডিফেন্স প্যাক্ট নিয়ে তো আমরা আগ্রহ প্রকাশ করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর মক্কা নিয়ে তো সবসময়ই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে একটা আলাদা জায়গা আছে। ইসলামিক ন্যাশনসদের মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে সেখানে তো আর অস্বাভাবিক না যাওয়া। সো, লেটস সি, ইটস বিয়িং ভিউড পজিটিভলি (এটা ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে)।’

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তবে জাতীয় স্বার্থ, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনীতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং বহুমাত্রিক। বিশেষ করে সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত রয়েছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।’

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘সৌদি আরবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের সঙ্গেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিধি বেড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান বিবেচনা থাকবে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা এবং দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা। প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব, সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ—সব দিক বিশ্লেষণ করার পরই সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাবে।’

আর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ।’

বিজ্ঞাপন

আরো

অপূর্ব কুমার - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর