নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কারণ হিসেবে হিমবাহের একটি খণ্ড ভেঙে নিচে পড়াকে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগের পর নেপালে পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি পর্যটক। অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
কী ঘটেছিল?
দুর্যোগের সূত্রপাত হয়েছিল হিমালয়ের অনেক উঁচুতে। স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশের বড় একটি খণ্ড ভেঙে পড়ে। প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে পড়ে যাওয়ার সময় বরফের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলি যুক্ত হয়। এই বরফ-পাথরের বিশাল ধস তিব্বতের লেন্দে নদীতে গিয়ে পড়ে। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি নদীটির ওপর ধ্বংসাবশেষ সাময়িকভাবে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ হঠাৎ করে নিচের দিকে ছুটে যায়। এর ফলেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও কাদার স্রোত।

আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয়ে যাওয়া এলাকা। ছবি: আল জাজিরা
প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহ ধসে পড়েছে। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্প নয়, ভূমিধসের কারণেই ওই ভূকম্পন সংকেত তৈরি হয়েছিল। ভূমিধসটি নিজেই পরে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা
নেপালের রাসুয়া জেলার তিমুরে ও সিয়াপ্রু বেসি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে। লেন্দে খোলা নদীর পানি পরে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে। ত্রিশূলী নদীতে মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায় বলে জানা গেছে। পরে বন্যা নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিভিন্ন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে বাড়িঘর, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিব্বতের দিকে গিরং কাউন্টির গিরং বন্দরে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে। ওই এলাকায় উদ্ধারকাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরু পলির স্তর। ত্রিশূলী নদী পরে নারায়ণী নদীর সঙ্গে মিশেছে। এই নদী ভারতের বিহারে প্রবেশের পর গণ্ডক নামে পরিচিত।
নিখোঁজদের মধ্যে বেশিরভাগই বিদেশি পর্যটক
নেপালে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি পর্যটক রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৭৭, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন।
তিব্বতে নিখোঁজ ৫৫৮ জনের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। দুর্যোগের সময় তাদের অনেকেই তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবরের দিকে যাত্রা করছিলেন। পর্যটন কর্মকর্তারা এখন বিভিন্ন দলের সদস্যদের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
চলছে উদ্ধার অভিযান
নেপালে ৫ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করে নিখোঁজদের সন্ধান করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষের কাছে হেলিকপ্টারে করে তাবু, খাবার ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

ছবি: আল জাজিরা
আহত অন্তত ৬৫ জন স্থানীয় হাসপাতাল ও কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে অনেককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক, নদীতে পানির উচ্চতা এবং পুরু কাদার স্তরের কারণে অনেক এলাকায় এখনো উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারেননি। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
তিব্বতের দিকেও পরিস্থিতি নজরদারিতে রেখেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। দুর্যোগস্থলের উজানে একটি হ্রদ এখনো বাঁধের মতো অবস্থায় রয়েছে। সেটি ভেঙে গেলে নতুন করে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা
ভারত নেপালে প্রায় ১০ টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে একটি উদ্ধারকারী বিমান পাঠিয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশন নেপাল রেড ক্রসের ত্রাণ কার্যক্রম ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ জরুরি অর্থ সহায়তা দিয়েছে। জাতিসংঘও নেপালের ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য কর্মী মোতায়েন করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন দুর্যোগকবলিত এলাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ও মানচিত্র তৈরির জন্য তাদের কোপার্নিকাস জরুরি ব্যবস্থাপনা সেবা সক্রিয় করেছে।
দুর্যোগে কয়েকজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার পর দেশটি নেপালে একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ পাঠানোর পাশাপাশি ৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।