Saturday 05 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

দলের ভেতর-বাইরে ষড়যন্ত্র হচ্ছে— সতর্কবার্তা মির্জা আব্বাসের

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:২৬

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: বিএনপির বিরুদ্ধে দলের ভেতর ও বাইরে থেকে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। একই সঙ্গে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, দলের কিছু নেতা-কর্মী সামনে ভালো কথা বললেও বাইরে গিয়ে ভিন্ন কথা বলেন।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘এর মধ্যে অনেক কিছু হবে, হচ্ছে। সব কিছু আপনার (তারেক রহমান) কানে যায় না। আমাদের কাছে যা আসে, যেগুলো আসে, ইনশাল্লাহ আপনাকে জানাব।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘এই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দলের ভেতর থেকে হচ্ছে, দলের বাইরে থেকে হচ্ছে। এটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।’

দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘যেগুলো আপনি জানবেন, ওগুলো কথায় এবং কাজে নেতাকে জানিয়ে দেবেন। কারণ কোনো কিছু গোপন থাকলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। আর হাত দিয়ে রাতের অন্ধকার কিংবা দিনের আলো ঢেকে রাখা যায় না। এটা প্রকাশ হবেই।’

তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে এই দলের বিরুদ্ধে, অনেক ষড়যন্ত্র হবে এই দলের বিরুদ্ধে। অনেক ষড়যন্ত্র হবে মাননীয় নেতা, আপনার বিরুদ্ধে। আপনি দয়া করে সাবধানে থাকবেন।’

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘বহু কর্মী আছে, নেতা আছে যারা আপনার সামনে অনেক ভালো ভালো কথা বলে, কিন্তু বাইরে এসে ভালো কথা বলে না। কখনো একাকীত্বে জিজ্ঞেস করেন, আমি আপনাকে সেগুলো বলব। কিন্তু বিষয়গুলো সম্বন্ধে আপনার একটু সাবধান হওয়া উচিত।’

‘কিছু নেতা-কর্মীর জন্য বদনাম হচ্ছে’

বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ডে দলের বদনাম হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, ‘আমার অনেক নেতাকর্মী আছেন… কিছু মনে করবেন না, আমি খোলাখুলি বলি—কিছু নেতা-কর্মীর জন্য বদনাম হচ্ছে।’

নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আপনাদের বয়সটা আমাদের ছিল। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে থেকে রাজনীতি করেছি, রাজনীতি শিখেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে থেকে রাজনীতি করেছি। কিন্তু আমাদের সময়ের দুয়েকজন হাতে গোনা লোক ছাড়া এই দলের কোনো বদনাম আমাদের মাধ্যমে হয়নি।’

দলের বর্তমান নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি সঠিক নেতৃত্ব দেন এবং সঠিক বিষয়গুলো নেতার কানে তুলে ধরেন, তাহলে নিশ্চয়ই দলটা টিকে থাকবে।’

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘একটা দল ৪৮ বছর হয়েছে। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা যিনি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই দলের ওপর অত্যাচার কম হয়নি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জেল খেটেছেন, আমরা জেল খেটেছি। দলটা এখনো ঠিক আছে। দলটা আরও টিকে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘এ দলটা মরে যাওয়ার জন্য আসেনি, ভেঙে যাওয়ার জন্য আসেনি। দুয়েকজন লোকের জন্য দলটা বদনাম হতে পারে না। এটা একটু আপনারা খেয়াল রাখবেন।’

‘দয়া করে দলটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন’

দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘দয়া করে যে যা করেন, না করেন, দলটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। এই দলটা দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখবে।’

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘বিএনপি তো একটি দলের নাম নয়, বিএনপি মানে স্বাধীনতার চেতনা, বিএনপি মানে গণতন্ত্র, বিএনপি মানে মানুষের অধিকার।’

তিনি বলেন, ‘আমরা একই আদর্শে অটল। অনেক ঝড় এসেছে, আমরা ভেঙে পড়িনি। নির্যাতন এসেছে, আমরা মাথা নত করিনি। কারণ, আমরা শহিদ জিয়ার সৈনিক।’

‘বিএনপিতেই আমার রাজনীতি শেষ হবে’

নিজের রাজনৈতিক জীবনের শেষ নিয়েও আবেগঘন বক্তব্য দেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো দল করি নাই, কোনো দল থেকে আসি নাই। আর কোনো দলে কোথাও আমি যাব না কোনোদিন, ইনশাল্লাহ। শহিদ জিয়াউর রহমানের হাতে রাজনীতিতে এসেছিলাম, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার স্নেহ পেয়েছি। আপনার সঙ্গে রাজনীতি করি, আমার রাজনৈতিক জীবন শেষ করতে চাই।’

তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কখনোই আপনি আমার কাছ থেকে কিংবা আমি আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। বিএনপিতেই আমার রাজনীতি, ইনশাল্লাহ শেষ হবে।’

আবেগাপ্লুত হয়ে ক্ষমা চাইলেন মির্জা আব্বাস

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমি যদি খারাপ কিছু বলে থাকি, কাউকে যদি আহত করে থাকি, আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি কাউকে আহত করার জন্য, দুঃখ দেওয়ার জন্য, কষ্ট দেওয়ার জন্য এ কথা বলিনি।’ এরপর আবেগপ্রবণ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই দলটাকে আমি অনেক ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি।’

অসুস্থ শরীরেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আব্বাস

সাড়ে পাঁচ মাস বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত বুধবার দেশে ফেরেন মির্জা আব্বাস। অসুস্থতার মধ্যেই শনিবার হুইলচেয়ারে করে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় যোগ দেন। মঞ্চে ওঠার সময় একজনের সহায়তা নিয়ে হাঁটেন মির্জা আব্বাস। পরে তারেক রহমানের পাশের আসনে বসেন তিনি।

অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমি পরিপূর্ণভাবে সুস্থতা লাভ করিনি। এর মধ্যে আমি দেশের মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি। ভালোবাসা পেয়েছি দেশের গণমানুষের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান আমাদের নেতা তারেক রহমানের।’ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারেক রহমান নিয়মিত তার খোঁজখবর নিয়েছেন।

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে যেমন স্নেহ পেয়েছিলাম, তেমনি পেয়েছি আমাদের নেতা তারেক রহমানের অকুণ্ঠ সমর্থন-সহযোগিতা।’

‘বিবেকের তাড়নায় এসেছি’

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে নিজের উপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আজকের এই মিটিংয়ে আমি আসছি বিবেকের তাড়নায়। আমি একটা দল করি। ৪৮ বছরে বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া, অসুস্থতা ছাড়া, আমার কোনোদিন এই দিনটা মিস হয়নি। বিএনপির অনেক কাজ মিস হয়েছে, কিন্তু এই দিনটি আমি মিস করিনি, করব না কোনোদিন।’

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দীন টুকু অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

সভায় অর্থনীতিবিদ মাহবুবউল্লাহ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম, ইসমাইল জবিহউল্লাহ, জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, ঢাকা মহানগর বিএনপি দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, উত্তরের সদস্য সচিব মোস্তফা জামান ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই দলটি বর্তমানে ৪৮ বছর পার করছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর