Sunday 30 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

সিরাজগঞ্জে বাড়ছে হাম-ডেঙ্গু, হাসপাতালের মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩০ আগস্ট ২০২৬ ১৪:৩৭

সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জে তীব্র গরম ও পরিবর্তিত আবহাওয়ার প্রভাবে বাড়ছে হাম, ডেঙ্গুসহ নানা রোগের সংক্রমণ। প্রতিদিনই জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগী বেশি হওয়ায় অনেককে হাসপাতালের ওয়ার্ডের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে আসায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি মেঝেতেও রোগী ভর্তি রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই শয্যায় একাধিক রোগীকে সামাল দিতে হচ্ছে। রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও দীর্ঘ সময় হাসপাতালের ভেতরে অবস্থান করতে হচ্ছে। এতে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ ও সেবাব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

গত কয়েকদিন ধরে সিরাজগঞ্জে অব্যাহত রয়েছে তীব্র গরম। এর মধ্যেই শিশুদের মধ্যে জ্বর, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, খাবারে অনীহা, শরীরে দুর্বলতাসহ নানা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। এসব সমস্যা নিয়ে প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে ছুটছেন হাসপাতালে। চিকিৎসকদের কাছে আসা রোগীদের অনেকের মধ্যেই হাম ও ডেঙ্গুর উপসর্গ পাওয়া যাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি। নির্ধারিত শয্যায় জায়গা না থাকায় অনেক রোগীকে ওয়ার্ডের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ফলে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মা সালেহা বেগম বলেন, ‘শিশুর কয়েকদিন ধরে জ্বর ও শরীর খারাপ ছিল। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েছি। পরে অবস্থা ভালো না হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে এসে দেখি অনেক রোগী। বেড খালি না থাকায় মেঝেতেও রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। আমাদেরও বেশ কষ্ট হচ্ছে, তবে চিকিৎসকরা নিয়মিত রোগী দেখছেন।’

আরেক রোগীর স্বজন মো. ফরহাদ আলী বলেন, ‘হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। শিশুদের নিয়েই বেশি ভিড় দেখছি। বেড না পেয়ে অনেকেই মেঝেতে অবস্থান করছেন। গরমের মধ্যে শিশুদের নিয়ে এভাবে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। তবে ডাক্তার-নার্সরা তাদের সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। রোগীর চাপ কমাতে আরও বেড ও চিকিৎসক-নার্স প্রয়োজন।’

সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৮ জন। এ পর্যন্ত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ৩১ জন।

অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২৭ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭২ জন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৪৮ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাম পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা নতুন করে বাড়ছে। বিশেষ করে আবহাওয়া পরিবর্তন, অতিরিক্ত গরম ও মশার বিস্তারের কারণে ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে শিশুদের মধ্যে মৌসুমি বিভিন্ন রোগের প্রকোপও দেখা দিচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ টি এম নুরুজ্জামান বলেন, ‘অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে চিকিৎসক ও নার্সদের বাড়তি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর মধ্যেই রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীদের চিকিৎসায় কোনো ধরনের ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। শিশুদের অসুস্থতা এড়াতে অভিভাবকদেরও সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি।’

তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় শিশুদের জ্বর, সর্দি-কাশি, বমি, খাবারে অনীহাসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময় শিশুদের পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। কোনো শিশুর জ্বর বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।’

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে শিশুদের নিয়ে চিকিৎসার জন্য সিরাজগঞ্জ শহরে আসছেন। স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরও উপসর্গ না কমায় অনেককে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে রোগীর ভিড় বাড়ছে।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের অনেক সময় মেঝেতে অবস্থান করতে হচ্ছে। এতে একদিকে রোগীদের শারীরিক কষ্ট বাড়ছে, অন্যদিকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যেও রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমিন জামান বলেন, হাম পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা নতুন করে বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং দিনের বেলায়ও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বর হলেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে শরীরে লালচে দাগ, বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খাবারে অনীহা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও জ্বরকে সাধারণভাবে না দেখে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে হাসপাতালে হাম ও ডেঙ্গুর রোগীর পাশাপাশি অন্যান্য মৌসুমি রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। এতে সীমিত শয্যা ও জনবল দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জনবল ও শয্যা বৃদ্ধি প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করলেই রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রোগ প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা, বিশুদ্ধ পানি পান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

হাম ও ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য রোগীর চাপও বেড়ে যাওয়ায় সিরাজগঞ্জের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। সীমিত অবকাঠামো ও জনবল দিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা সংকট। দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোর শয্যা ও জনবল সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে কার্যকর জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।

সারাবাংরা/এএ
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর