ঢাকা: বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। নিকটতম দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গত কয়েকদিনের কূটনৈতিক তৎপরতা সেই বার্তায় দিচ্ছে। চলতি বছরে জাতীয় নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সরকার গঠন এবং বাংলাদেশের ভারতের কূটনীতিক হিসেবে হাই প্রোফাইলের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগের পর দুই দেশের যোগাযোগ বাড়তে শুরু করে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে ধারণ করে ভারত ও বাংলাদেশের নতুন সম্পর্ককে সামনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমাধান অযোগ্য কোনো সমস্যা নেই। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা নিরসনে সরকার কাজ করছে।’ তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে নিজেই বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো সংকট নেই যা সমাধান করা অসম্ভব। বাংলাদেশ থেকে ইতিবাচক বার্তা নিয়েই তিনি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলাপ করতে গেছেন। ইতিবাচক ফলাফলের জন্য আমরা অপেক্ষায় আছি।’
এর আগে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির বিষয়ে ঢাকার বার্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন দেশটির হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের পর দিল্লিতে গিয়ে মঙ্গলবার নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনা করেন দীনেশ ত্রিবেদী।
সোমবার (১০ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর সাক্ষাতের পর ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন এক বার্তায় বলেছেন, জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। ভারতীয় হাইকমিশন বলেছে, হাইকমিশনার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান ও বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও দূরদর্শী মনোভাব নিয়ে একত্রে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তারা পারস্পরিক আগ্রহের বিষয়গুলোর ব্যাপারে মতবিনিময় করেন এবং জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
কূটনীতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশের বার্তা নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাৎপর্যপূর্ণ এই ঘটনাই বলে দেয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারত কতটা আগ্রহী। দুই দেশের সম্পর্কের পথে থাকা কয়েকটি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে নিশ্চয়ই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন হাইকমিশনার। আশা করা যায়, ঢাকায় ফিরে প্রধানমন্ত্রী মোদির দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা বাংলাদেশকে জানাবেন দীনেশ ত্রিবেদী।
গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সন্ধ্যায় ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে দীনেশ ত্রিবেদী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সারমর্ম তুলে ধরছিলেন তার কিছুক্ষণ আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফর এবং বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশগ্রহণ— এই দু’ভাবেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’ এই সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গই বিশেষ গুরুত্ব পায়।
একই দিন সচিবালয়ে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, “ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুনভাবে ‘রিঅ্যালাইন’ করতে হবে।” তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না, তবে বন্ধু পরিবর্তন করা যায়। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে; তবে তা হতে হবে দুই দেশের স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে।’
গত কয়েকদিনে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের মধ্যে বক্তব্যের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই প্রোফাইল হাইকমিশনারের বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দু’দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দিয়ে আসছেন।
গত ২৫ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশের দিন যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দেন, যা ছিল বাংলাদেশে ভারতে ভ্রমণকারীদের প্রাণের দাবি। এর পর থেকেই সম্পর্কের গতি ফিরতে শুরু করে। কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্ক কেবল একপাক্ষিক হয় না। এই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সুস্পষ্ট ইতিবাচক পদক্ষেপ।
তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন বেশ কিছু অমীমাংসিত ইস্যুতে আটকে আছে। বিশেষ করে মানবতা অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং সেখানে বসে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তির কারণ। বাংলাদেশ শুরু থেকেই শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। একইভাবে ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ফয়সাল এখন ভারতের কারাগারে বন্দি। ফয়সারের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে এই ইস্যুগুলোর সমাধান জরুরি। এই মুহূর্তে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্যেষ্ঠ এক কূটনীতিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়নে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো গঙ্গার পানি চুক্তি। ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সই হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চুক্তি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে দুই দেশ এরই মধ্যে আলোচনা শুরু করেছে। পাশাপাশি তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। সেটিরও সমাধান দরকার। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা ও কুশিয়ারা ছাড়া আর কোনো নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নেই। তাই আমাদের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পানি বণ্টন সমস্যার সম্মানজনক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে ভারতকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে।’
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্যতম চাওয়া হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতে পালিয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে ভারতকে দ্রুত এবং পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়টি ভারত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে বলে মঙ্গলবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন। শেখ হাসিনার ইস্যুটি আলাদা রেখে বাকি যেসব পলাতক দিনের পরদিন ভারতে অবস্থান করছেন তাদের ব্যাপারে ভারতকে পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে। বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত এসব ব্যক্তিরা ভারতের কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে ভারতকে এই সহস্রাধিক পলাতক ব্যক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভারতে পলাতকদের ফেরানো ছাড়াও দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনাও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সে কারণে সম্পর্ক নতুন করে গড়তে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে হবে। সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের বিষয়ে দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনারের সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের কাছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। তবে সেটি হবে নায্য ও সমতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের কিছু ইস্যু আছে সেগুলো ভারতের প্রতিনিধির কাছে আমরা উত্থাপন করেছি। উনি বলেছেন, বাংলাদেশের উদ্বেগ এবং চাওয়াকে ভারত গুরুত্ব দেয়।’ ভবিষ্যতে দুই দেশের মানুষে মানুষে সম্পর্ক স্থাপনে ভারতও কাজ করে যাবে বলে ত্রিবেদী উল্লেখ করেছেন।