ঢাকা: বর্তমানের জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিই আস্থা রাখছে প্রভাবশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারেক জিয়ার চীন সফরে নানা চুক্তি ও সমঝোতা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন আস্থা বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনীতির পরিচয় মিলছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষদূত সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর বিশ্লেষণের পর এমন আভাসই মিলছে।
সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর প্রসঙ্গে রোববার (২ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে চায়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের এই সফর ছিল মূলত একটি অনুসন্ধানমূলক সফর। এটি ছিল তার প্রথম ঢাকা সফর। তিনি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে চায়।’
তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটনের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আপনারা হয়তো বৈঠকগুলোর বিষয় দেখেছেন। এটি ছিল গোরের প্রথম সফর। তাই বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর সার্জিও গোর সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান রয়েছে। এ থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা ও পারস্পরিক আস্থার বিষয়টি বোঝা যায়। আমাদের সম্পর্ক এখন নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে।’
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বিস্তৃত অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আরও শক্তিশালী ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় দেশ।’
বাংলাদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়। আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসার নতুন সুযোগ খুঁজতে এবং সরকার ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক করতে চলতি মাসের শেষের দিকে ২৫টি শীর্ষ মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫ জন প্রতিনিধির একটি বাণিজ্য দল ঢাকা সফরে আসছে।’
শনিবার (১ আগস্ট) শেষ হওয়া গোরের সফর থেকে স্পষ্ট বার্তা এসেছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলার যে কূটনৈতিক কৌশল নিয়েছে, তা অন্তত এই মুহূর্তে সফল হয়েছে। বাংলাদেশের কূটনীতিকরা বোঝাতে সক্ষমত হয়েছেন, উন্নয়নের জন্য চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন। সে কারণে তারেক রহমান মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি বেইজিং সফর করেন, যেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দেন।
বেইজিংয়ের মতো ওয়াশিংটনও বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের প্রতি নিজেদের ভরসার কথা জানাতে চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সার্জিও গোর চলতি সফরে বলেছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। এই কারণে আগামীতে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ দূত গোরের এই ইতিবাচক বার্তা এবং ব্যবসায়িক দলের সফর দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন আগামীতে বাংলাদেশের সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে যেতে প্রস্তুত। সাবেক এক কূটনীতিকের মতে, ‘কূটনীতির একটি বড় কাজই হলো পারস্পরিক আলোচনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে দুই দেশের বন্ধুত্বকে পোক্ত করা।’ সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ঘরের ভেতরের আলোচনায় যাই হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠতা যে একটা স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই রয়েছে—এ নিয়ে ওয়াশিংটন সন্তুষ্ট বলেই মনে হচ্ছে।’
এর আগে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, তাদের মূল আলোচনা ছিল বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অভিবাসন এবং রোহিঙ্গা সংকট কেন্দ্রিক। আঞ্চলিক কৌশলগত বিষয়গুলো উঠে আসবে বলে ভাবা হলেও, আলোচনা মূলত দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমরা দুই দেশের সম্পর্কের নানা দিক, বিশেষ করে বিনিয়োগ, জ্বালানি ও অভিবাসন নিয়ে কথা বলেছি। সময়ের অভাবে হয়তো একদম গভীরে গিয়ে কথা বলা যায়নি, তবে সম্পর্ককে কোন দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে—তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।’
বৈঠক শেষে মার্কিন দূত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স হ্যান্ডেল’-এ জানান, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশকে ভ্রমণ ঝুঁকির ‘লেভেল ৩’ থেকে কমিয়ে ‘লেভেল ২’-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার জন্য আগের কড়াকড়ি বহাল রাখা হয়েছে।
বর্তমানে যুদ্ধ-বিধবস্ত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও চীনের মধ্যে নানা ইস্যুতে তীব্র মতভেদ চলছে। দেশ দু’টির মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ না চললেও বাণিজ্য যুদ্ধ, ইরান, ভেন্যুজুয়ালাসহ নানা ইস্যুতে মত-পার্থক্য রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে ধারণ করে ঢাকা সবসময়ই দুই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলার নীতি মেনে চলেছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পর পর উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকগুলো প্রমাণ করে, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির দিকে ঝুঁকে না পড়ে নিজের মতো নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগোচ্ছে।
সাবেক এক কূটনীতিক সারাবাংলাকে জানান, গোরের সফর থেকে দেওয়া প্রকাশ্য বার্তাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের পর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঠিক কেমন–সে বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন এখন সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও আশ্বস্ত। তিনি বলেন, ‘ঢাকার এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হবে মার্কিন দূতের এই সফল সফরের বিষয়টি একইভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে বেইজিংয়ের কাছে তুলে ধরা।’
দিনশেষে এই সফরটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ যেকোনো বড় শক্তির সঙ্গেই বন্ধুত্ব বাড়াতে প্রস্তুত, তবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখেই তা করা হবে।