ঢাকা: ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে ধারণ করে গড়ে ওঠা নতুন পররাষ্ট্রনীতির গতি-প্রকৃতি বুঝতে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। তিনি একাধারে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও পালন করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিষ্কার ধারণা নেওয়াই তার সফরের মূল লক্ষ্য বলে জানা গেছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাস পর প্রভাবশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কোনো কর্মকর্তার এটিই প্রথম সফর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরসহ নানা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে সার্জিও গোরের এই সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনের পর রাশিয়া সফরসহ নানা কূটনৈতিক যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সার্জিও গোরের ঢাকা আসাটা তাৎপর্যপূর্ণ।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বাইরে বিশেষ কোনো কৌশলগত উদ্দেশ্যে বিশেষ দূতদের পাঠানো হয়, যা নির্দেশ করে যে, সার্জিও গোরের সফরের মূল লক্ষ্য ঢাকার নতুন পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান অনুধাবন করা।
দুই দেশের কূটনীতিক সূত্রগুলো দাবি করেছে, সার্জিও গোর শুধুমাত্র একজন কূটনীতিক নন, তিনি একাধারে ব্যবসায়ী এবং প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্টজন। এ কারণে গোরের সফর কোনো সাদামাঠা সফর নয়। এই সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া সফরকালে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাবেন। এর বাইরে ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বর্তমানে মালদ্বীপ সফরে রয়েছেন। আগামী ২৮ জুলাই ঢাকায় ফিরবেন তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশেষ দূতের কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং মার্কিন কংগ্রেসের হাউজ ও সেনেটে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি সরাসরি হোয়াইট হাউজে রিপোর্ট করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের ঠিক এক মাস পর মার্কিন দূতের এই আগমন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, সেখানে মোংলা পোর্টের আধুনিকায়ন, তিস্তা নদী প্রকল্প, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন নিয়ে বিশেষ চুক্তি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীন চীন সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো সরব ছিল। ভারতে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে এসব নজর এড়ায়নি তার।
অন্যদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশে চূড়ান্ত মনোনয়নের আগে সিনেটে বলেছিলেন, বাংলাদেশে নিয়োগ পেলে তিনি বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে সামরিকসহ নানা চুক্তির বিষয়ে সতর্ক করবেন। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক ঢাকাস্থ চীনের দূতাবাস প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ ও চীনের দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক কোনো তৃতীয় দেশকে লক্ষ্য করে নয়। এ বিষয়ে অযাচিত মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখার আহ্বানও জানায় চীনা দূতাবাস।
এদিকে সম্প্রতি তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকা সফর করেছেন। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর রিয়াদ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও উচ্চপর্যায়ে সফরের নিমন্ত্রণ এসেছে। এ ছাড়া, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি রাশিয়া সফর করে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ঢাকা সফরকালে এ সব বিষয়ে তিনি খুঁটিনাটি জানতে চাইতে পারেন বলে কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিনিয়র এক কূটনীতিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণ রুটিন বাণিজ্য নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হলেও বিশেষ এই সফরের কেন্দ্রে থাকবে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের গভীরতা। এর বাইরে দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে ভারতের সঙ্গে ঢাকার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান, পাকিস্তান সম্পর্কিত মনোভাব, রোহিঙ্গা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে ইরান পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।’
ভূ-রাজনৈতিক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশ যেভাবে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে, তা পর্যালোচনায় দু’পক্ষের জন্যই এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা।