ঢাকা: বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে অর্থবছরের প্রথম দিকেই ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা । কিন্তু অর্থবছর শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি। আর অর্থবছর শেষে সরকারের নিট ঋণ ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে কথা হয় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘অর্থবছরের শুরুতে বিভন্ন কারণে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ে। আর এই ঋণ বাড়ার মূল কারণ হলো টার্গেট অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়া। খেয়াল রাখতে হবে, বাজেটে সরকার ব্যাংক ঋণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেটার চেয়ে যেন বেশি না হয়।’
এর কারণ দর্শাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের মাত্রা যদি বেশি হয় তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে না। বেসরকারি খাত ঋণ না পেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। দেশের অর্থনীতির গতিও বাড়বে না। ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে সরকারকে রাজস্ব আদায়ে জোর দিতে হবে। ভ্যাট ও টেক্সগুলো যাতে সরকারের খাতায় যোগ হয় সেটা নজর দিতে হবে।’
জানা গেছে, গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে। তথ্য মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় সরকারের নগদ অর্থের চাহিদা বেড়েছে। সেই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়, বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংকিং খাত থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশের তহবিল সরকারি খাতে চলে যায়, ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। ব্যাংক ঋণের চাপ কমাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, এবং সরকারি ব্যয়ে আরও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করা গেলে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
এদিকে, ৯ হাজার ২০৯ টাকা ব্যাংক ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়েছে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। এ টাকা ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স হিসাবের মাধ্যমে নিয়েছে। ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক সরকারকে দেওয়া একটি স্বল্পকালীন ঋণ সুবিধা। সরকারের দৈনিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি বা অসঙ্গতি মেটাতে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী ঋণ নয়, বরং নগদ অর্থের প্রবাহ ঠিক রাখার সাময়িক উপায়।
সরকারের নগদ অর্থের ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অর্থ দেয়। সাধারণত ৯০ দিন বা তিন মাসের মধ্যে এই ঋণ পরিশোধ করতে হয়। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার যখন ঋণ নেয় সেটা নতুন টাকা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ছাড়া, বাকি ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা নিয়েছে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। আর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের ব্যাংক ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে একবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেই সরকারের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ফলে ব্যয় নির্বাহে সরকারকে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়েছে।’