Saturday 29 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

‘গুমের সেই রাতের কথা মনে পড়লে শরীরে শিহরণ জাগে’

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৩০ আগস্ট ২০২৬ ০০:১৮

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।ফাইল ছবি

ঢাকা: ২০১৫ সালে গুম হওয়ার সেই রাতের কথা স্মরণে এলে এখনো শরীরে শিহরণ জাগে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রাক্কালে বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) রাতে গুম হওয়ার ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘১১ বছর আগের ঘটনা… স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করে। এখনো স্মরণে আসলে শরীরে শিহরণ জাগায়।’

তিনি বলেন, ‘চোখ বাঁধা কালো কাপড়ে, হাত বাঁধা স্টিলের হ্যান্ডকাফে। এক নয়, দুই নয়, দশ নয়, টানা ৩২ ঘণ্টা এভাবে কেটেছে আমার। সেই স্মৃতি এখনো আমাকে কষ্ট দেয়, মনের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়।’

বিজ্ঞাপন

২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকে অস্ত্রধারীরা তাকে তুলে নিয়ে যায় বলে জানান তিনি। এর পর তাকে আইনের হাতে সোপর্দ না করে অজ্ঞাত স্থানে বন্দি রাখা হয়। দুই মাসেরও বেশি সময় পর পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, তিনি ভারতের শিলংয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘উত্তরার একটি বাসা থেকে আমাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে সাদা পোশাকে অস্ত্রধারীরা তুলে নিয়ে যায়। কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে ফেলে, হাত বেঁধে ফেলে। তারপরের ঘটনাগুলো আরও ভয়ংকর।’

তিনি বলেন, ‘আমাকে পাঁচ ফুটের একটি কুঠরিতে ৬১ দিন রেখেছিল। এই ৬১টি দিন কখন রাত, কখন দিন—কিছুই আমি জানতে পারিনি। ওখানে খাবার দেওয়ার জন্য দরজার নিচে একটি জায়গা ছিল। বাইরে ফ্যান ছিল, আওয়াজ হতো বায়ু সঞ্চালনের জন্য। আমাকে কখনো ওখান থেকে বের করেনি, কেবল রুম পরিষ্কারের জন্য দরজার বাইরে বের করেছিল। প্রতি মুহূর্তে আমি মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনছিলাম।’

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘এখন যে আয়নাঘরের বর্ণনা গণমাধ্যমে বেরিয়ে আসছে, আমরা বন্দিজীবন তার চেয়ে কঠিন অবস্থায় কাটিয়েছি। বর্ণনা করলে শরীরে যেন একরকম কাঁপুনি ধরে।’

গুমের পর সীমান্তের ওপারে ফেলে যাওয়ার অভিযোগের পর অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলায় ভারতের শিলংয়ে দীর্ঘদিন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে হয় সালাহউদ্দিন আহমদকে। পরে তিনি ওই মামলায় খালাস পান। তবে আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় দেশে ফিরতে পারেননি।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১১ আগস্ট দেশে ফেরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, “যেদিন আমাকে আয়নাঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল, সেদিন দীর্ঘ একটা যাত্রা। চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে… তারপর শিলংয়ের একটি জায়গায়, এটাকে গলফ মাঠ বলা হয়। সেখানে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাউ।’”

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দেশে ফেরার জন্য দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ধরে আইনি লড়াই করতে হয়েছে। এ সময় ভারত সরকার তার খালাসের বিরুদ্ধে আপিলও করেছিল। পরে আদালত খালাস বহাল রেখে তাকে নিজ দেশে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার মতো অনেকেই—আমার সহকর্মীদের মধ্যে, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে, এমনকি সাংবাদিকরাও এই গুমের শিকার হয়েছেন। তারা অনেকেই আমার মতো সৌভাগ্যবান হননি যে বেঁচে আছেন বা তাদের খুঁজে পাওয়া গেছে। সেই দিক থেকে আমি অনেক সৌভাগ্যবান। মহান আল্লাহর দরবারে অবনতচিত্তে শুকরিয়া আদায় করছি।’

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্বিষহ যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যারা গুম হয়ে আছেন, সেসব পরিবারের বেদনা আমার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করলে আপনারা জানতে পারবেন। যারা এখনো গুম হয়ে আছেন, আপনি তাদের সঙ্গে কথা বলেন—বুঝতে পারবেন তাদের বুকের ভেতরের কান্নার কথা, অবর্ণনীয়-অসহনীয় দুঃখ-যন্ত্রণার কথা।’

তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ যদি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন, তার দাফন হয়, তাকে স্মরণ করা হয়, কবর জিয়ারত করার সুযোগ পায় তার পরিবার। কিন্তু গুম হলে কিংবা খুঁজে না পাওয়া গেলে এই সুযোগটাও যখন একজন মানুষের থাকে না, তখন তাদের বেদনা, তাদের পরিবারের কষ্ট যে কত গভীর হতে পারে, সেটা কোনো ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে না।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একটা বিষয় আমি নিশ্চিত করে বলতে চাই—এই দেশের মাটিতে ইনশাআল্লাহ প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিচার হবে। আয়নাঘরের বন্দিশালা তৈরি করে যারা ভিন্নমতকে দমনের কুশীলব, তাদের রেহাই নেই। অবশ্যই, অবশ্যই তাদের আদালতের মাধ্যমে বিচার করা হবে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর