Saturday 15 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

কৃষিসমৃদ্ধ রংপুরে প্রতি ৫ জনে একজন দারিদ্রসীমার নিচে

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২০ মে ২০২৬ ০৮:০৩ | আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ১১:১১

কৃষিসমৃদ্ধ রংপুরে প্রতি পাঁচ জনে একজন দারিদ্রসীমার নিচে। ফাইল ছবি: সারাবাংলা

রংপুর: চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মৌসুমি বেকারত্বের চক্রে আবদ্ধ উত্তরবঙ্গের কৃষি শ্রমিকেরা। কৃষিতে জাতীয় রেকর্ড গড়লেও শিল্পের অভাবে প্রতি পাঁচজনে একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিপণ্য ও কম মূল্যের শ্রম এ অঞ্চলের প্রধান সম্পদ হওয়ায় এই দু’টি ব্যবহার করে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুললে স্থানীয় ও জাতীয় চাহিদা পূরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছানো সম্ভব। তবে কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং বিতর্ক ও অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এরই মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, নতুন ইপিজেড উদ্যোগ কি ঘুচাতে পারবে এই বৈপরীত্য?

বিজ্ঞাপন

নিজ এলাকায় কাজের সংকটের কারণে বছর তিনেক আগে রংপুর শহরে এসেছিলেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কৃষিশ্রমিক জাহিদুল ইসলাম (৫০)। কৃষিকাজের পাশাপাশি ইমারত নির্মাণ ও টাইলসের কাজও রপ্ত করেছেন তিনি। তবে বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজে দক্ষ হয়েও নিয়মিত কাজ পান না। সম্প্রতি রংপুরের শাপলা চত্বরে জাহিদুলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাজারের ব্যাগে জামাকাপড়সহ সেখানে কাজের সন্ধানে এসেছিলেন তিনি। আক্ষেপ নিয়ে জাহিদুল বলছিলেন, ‘ভুঁই (জমি) নিড়ানি, রাজমিস্ত্রি, স্যানিটারি মিস্ত্রি, হেলপারি (রাজমিস্ত্রির জোগালি)— সব কামোতে পাই। যেটে (যেখানে) নিয়া যায়, সেটে যাই। তা–ও একদিন কাজ পাই, তো আরেক দিন পাই না।’

শুধু জাহিদুল নন, রংপুরের গণেশপুর শান্তিপাড়ার নির্মাণশ্রমিক সুমন মিয়া সারাবাংলাকে জানান, দুই দিন ধরে তিনি কাজ পাচ্ছেন না। এমন চললে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শিগগিরই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। এই উদাহরণ দু’টি উত্তরবঙ্গের একটি বড় অর্থনৈতিক সত্যের প্রতিচ্ছবি মাত্র।

কৃষির সিংহভাগ উৎপাদন, তবুও কেন দারিদ্র্যের রেকর্ড?

ঢাকা বা চট্টগ্রামের তুলনায় রংপুর অঞ্চলে ভারী শিল্প, গার্মেন্টস বা রফতানিমুখী কলকারখানা গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপরু নির্ভরশীল। সরকারি বিভিন্ন দফতরের তথ্য বলছে, রংপুর অঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনের প্রধান জোগানদাতা। দেশের মোট চালের ১৭ শতাংশ, আলুর ৩৫ শতাংশ এবং ভুট্টার অর্ধেকেরও বেশি আসে এই বিভাগ থেকে। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার (২২২ শতাংশ নিবিড়তা) থাকা সত্ত্বেও কৃষিনির্ভর শিল্পের প্রসার না ঘটায় জাহিদুলের মতো কৃষিশ্রমিকেরা কর্মসংখ্যার অভাবে মৌসুমি বেকারত্বে ভোগেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, জাতীয় গড় দারিদ্র্য ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও রংপুর বিভাগে এই হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ এখানে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিকাজ মৌসুমি হওয়ায় বছরের একটি বড় সময় আয় অনিশ্চিত থাকে, যা দারিদ্র্যকে স্থায়ী করে তোলে।

কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণই সমাধান?

কৃষি অর্থনীতির গবেষক ও বিশ্লেষক রায়ান আহমেদ রাজুর মতে, এ অঞ্চলের দুটি প্রধান সম্পদ—প্রচুর কৃষিপণ্য এবং কম মূল্যের শ্রম। এই দুটি ব্যবহার করে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুললে স্থানীয় ও জাতীয় চাহিদা পূরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছানো সম্ভব।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, আলু সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত হিমাগার এবং হাড়িভাঙা আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের গতি ধীর।

উত্তরের দরজায় কড়া নাড়ছে ইপিজেড, তবে জমির লড়াই ও অবকাঠামো সংকট

দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি আশার আলো দেখিয়েছে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। গত ১৫ এপ্রিল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় রংপুর ইপিজেড করার ঘোষণা দেয় তারা।

বেপজা সূত্র জানায়, রংপুর সুগার মিলের ৪৫০ একর জমি এরই মধ্যে ইপিজেডের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেখানে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে এই প্রকল্পের পুরো আওতায় ১ হাজার ৮৪২ একর জমি রয়েছে, যার একটি বড় অংশ আগে আখ চাষের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল।

ইপিজেড ঘোষণার পরেই শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। গোবিন্দগঞ্জের শাহেবগঞ্জ-বাগডাফার্ম এলাকার সাঁওতাল সম্প্রদায় ও জমির মালিকরা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তাদের দাবি, ১৯৫৬ এবং ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকার এই উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করেছিল চিনিকলের জন্য, শর্ত ছিল—কারখানা বন্ধ হলে জমি ফিরিয়ে দেওয়া হবে। ২০০৪ সালে চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলেও জমি ফেরত দেওয়া হয়নি। তাদের অভিযোগ, ইপিজেড স্থাপন এই জমি দখল করে রাখার একটি কৌশল।

অন্যদিকে, গোবিন্দগঞ্জের সাধারণ মানুষ এবং জামায়াতের মতো সংগঠনগুলো ইপিজেড দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে স্মারকলিপি ও বিক্ষোভ সমাবেশ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, এটি এলাকার অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দেবে এবং প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

এই জটিলতার বাইরেও রংপুরে শিল্পায়নের মূল অন্তরায় হচ্ছে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট। বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস সংযোগ না থাকায় বড় শিল্প স্থাপন সম্ভব নয়। রংপুর চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক পার্থ বোস সারাবাংলাকে জানান, জ্বালানি সমস্যার পাশাপাশি স্বল্প সুদে ঋণ বণ্টনে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য ও কর অবকাশের অভাবে বিনিয়োগ আসছে না।

এদিকে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে জানান, কাউনিয়ায় ৪২৮ একর জমিতে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং বন্ধ শ্যামপুর চিনিকলকে শিল্পনগরীতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে গবেষক ও বিশ্লেষক রায়ান আহমেদ রাজু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় গ্রামগঞ্জের নিম্ন আয়ের লোকজনকে ঢাকা বা চট্টগ্রামের পোশাক কারখানায় পাড়ি জমাতে হচ্ছে। এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং বিতর্ক ও অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার কোনো বিকল্প পথ নেই বলে মনে করেই এই বিশ্লেষক।

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর